
সাদা পাথর স্বচ্ছ নীল জলের স্রোতে আকাশের নিচে চারপাশে পাহাড়ের গাঁয়ে ভেসে বেড়ানো মেঘের ভেলায় রুপ নিয়েছে এক টুকরো 'কাশ্মীর'। 'বাংলার কাশ্মীর' দেখতে মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলা থেকে তারুণ্য নাট্য গোষ্ঠী ও উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর নেতৃবৃন্দ ও শিল্পীদের নিয়ে কোম্পানীগঞ্জের ভোলাগঞ্জের উদ্দেশে বাস গাড়ীযোগে রওনা হলাম ৪৩ সদস্যের টিম নিয়ে।
যাএা পথে কলা ও বেঙ্গলের ব্রেড দিয়ে সকালের নাস্তা সেরে নিলাম। বড়লেখা থেকে সড়কপথে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জ অভিমুখে আমাদের গাড়ি এগিয়ে যাচ্ছে রাস্তার দুপাশে সারি সারি গাছপালা দৌড়াচ্ছে, ঘুরছে ঘরবাড়ি। গড়িতে প্রচন্ড সুরে বাজছে শিল্পিদের গান। একে অপরের সাথে নানা খুনসুটি, ভ্রমণ নিয়ে রাজ্যের সব গল্প গুজব। মাঝে মধ্যে হৈহুল্লোর।আমাদের ছোট ছোট শিল্লীদের পাগলামি আর নানা ভাষায় কথা বলছে। গাড়ির ঝাকুনিতে গান আর কথা বুঝি আর না বুঝি, মাথা নেড়ে সায় দিতে হচ্ছে; মাথা না নাড়লেই বেতাল।
একবার গাড়ি উঁচুতে উঠছে আবার ঢালুতে নামার সময় প্রাণ কাঁপা কাঁপা অবস্থার মধ্যেও মনে আনন্দের ঢেউ। আঁকাবাঁকা এসব সড়কের দুপাশে প্রকৃতির বৈচিত্রময় রূপ দেখছি গাড়ির জানালার ফাঁকে চোখ বুলিয়ে। হঠাৎ রাস্তায় মাইল মিটারে দেখলাম ভোলাগঞ্জ ১০ কিলোমিটার। কোম্পানীগঞ্জ যতই পেছনে পড়ছে ততই চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠছে মেঘালয় রাজ্য আর খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড়। বিশাল বিশাল নীল পাহাড় হাতছানি দিয়ে ডাকছে আমাদের। পাহাড়ের কোলে নীল আকাশে মেঘের ভেলা ভেসে বেড়াচ্ছে। সময়ে সময়ে বাহারি রূপ নিচ্ছে নীল পাহাড়গুলো। যাওয়ার পথে পাথর তোলার দৃশ্য, পাথর কোয়ারীতে পাথর ক্রেসিংয়ের ঝনঝন শব্দ আর সবুজ প্রকৃতি মুগ্ধ করবে যে কাউকে। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম ভোলাগঞ্জ জিরো পয়েন্টে।
ঘাটে সারি সারি পর্যটকবাহী ট্রলার নৌকা। ঘাটজুড়ে পর্যটকদের ঘিরে নানা ব্যবসার বাহারি সব আয়োজন। খাবার হোটেল থেকে শুরু করে রকমারি পণ্যের দোকান। ইন্ডিয়ান পণ্যের পসরা সাজানো দোকানও চোখে মিলছে। এমনকি গাড়ি পার্কিং পাবলিক টয়লেটও। পাবলিক টয়লেটের গায়ে সাইনবোর্ডে লেখা 'টয়লেট ব্যবহার ১০ টাকা, কাপড় পরিবর্তন ১০ টাকা।' এখানে সেখানে পর্যটকদের নিয়ম ও সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড।
ঘাটের একপাশে চোখে পড়লো 'সামনে ভারত' সাবধানবাণীর বড় একটি সাইনবোর্ড। পেছনে কাঁটাতারের বেড়া, সামনে বিজিবির চৌকি। ঘাট এলাকায় সবকিছুই দর কষাকষি করে না নিলে পর্যটক শিকারীদের পকেট কাটার খপ্পরে পড়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। এসবের মাঝে খুবই ভালো লাগলো ট্রলার ভাড়ার সিস্টেম। কোন দামাদামি বা গলাকাটা দাম হাতিয়ে নেয়ার কোন সুযোগই নেই। ট্রলার ভাড়া নিতে হলে কাউন্টার থেকে টিকিট কাটতে হবে। ঘাট থেকে সাদা পাথরের রাজ্যে আপডাউন ৮০০ টাকা। টিকিটের সিরিয়াল অনুযায়ী নির্দিষ্ট ট্রলারের মাঝি কাউন্টারের কাছে দাঁড়িয়ে থাকে। টিকিট ক্রয় করে মাঝির হাতে ধরিয়ে দিলাম। ফিরতি ট্রিপে আসতে মাঝির মোবাইল নাম্বার টুকিয়ে নিতে ভুলবেন না কিন্তু। ধলাই নদীর তীরে ভিড়ে থাকা আমাদের জন্য ট্রলারে উঠে বসলাম। উপর থেকে ধলাই নদীর পানি নীল দেখা গেলেও কাছে এসে দেখলাম সচ্ছ সাদা। আমাদের নিয়ে ইঞ্জিনচালিত ট্রলার যাত্রা শুরু করলো ধলাই নদীর আঁকাবাঁকা পথে সাদা পাথরের উদ্দেশে।
নদীর ঢেউ ভেঙে ট্রলার যতই এগিয়ে যাচ্ছে, নীল জলরাশি আর ভারতের মেঘালয়ের সারি সারি পাহাড়ের নয়নাভিরাম দৃশ্য আর হিমেল হাওয়া আমাদের মন কেড়ে নিচ্ছে। অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি এই জায়গাটি বাংলার কাশ্মীর বললে ভুল হবে না। মাঝে মাঝে ঢেউ নৌকায় আছড়ে পড়ে শরীর ভিজিয়ে দিচ্ছে। মিনিট বিশেক ধলাই নদীর জলের ধারা ভেঙে ট্রলার নিয়ে পৌঁছলাম সাদাপাথরের রাজ্যে। ট্রলার থেকে নেমে বালুচরের রাশি রাশি বালি মাড়িয়ে স্বপ্নের সাদাপাথরের উপর বয়ে যাওয়া স্বচ্ছ জলরাশিতে পৌঁছালাম আমরা। সেখানে নানা বয়সি পর্যটকদের উপচেপড়া ভিড়।
যতদূর দৃষ্টি যায় দুদিকে সাদা পাথর, মাঝখানে স্বচ্ছ নীল জল। শান্ত পাহাড়, সঙ্গে মিশেছে আকাশের নীল। আকাশে ছোপ ছোপ শুভ্র মেঘ। পাহাড়ে মেঘের আলিঙ্গন। এ যেন প্রকৃতির এক স্বর্গরাজ্য।
ওপারের মেঘালয় চেরাপুঞ্জি থেকে নেমে আসা জলের স্রোত ফকফকে সাদা পাথরের উপর ঢেউ খেলে বয়ে যাচ্ছে উদ্যাম নৃত্যে। এসব ঘিরে এক অদ্ভুত সৌন্দর্যের ক্যানভাস। সৃষ্টিকর্তা নিজ হাতে সাজিয়েছে সাদা পাথরের রাজ্য। চোখ ধাঁধানো দৃশ্য দেখলে মুহূর্তেই মন ভালো হয়ে যায়।
সাদা পাথরের উপর গড়িয়ে যাওয়া নীল স্বচ্ছ পানিতে আমরা পা রাখি। সামনে সবুজ পাহাড়; পাশেই পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়া প্রচণ্ড স্রোতের স্বচ্ছ শীতল জল আর সে জল থেকে গড়িয়ে নামা সাদা পাথর— কী অপরূপ দৃশ্য, তা বলে বোঝানোর নয়! আমরা পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়া শীতল জলে ঝাঁপিয়ে পড়ি, আহা কী ঠাণ্ডা!
সাদা পাথরের উপর বয়ে যাওয়া স্বচ্ছ পানিতে গাঁ ভেজাতেই শুরু হলো ক্যামেরা ক্লিক।যে যার মতো তুলছে ছবি।কি যে আনন্দ,সবাই নিজ নিজ সিষ্টেমে আনন্দ করেছে; গাঁ ভাসিয়ে নয়, অপরুপ দৃশ্য আর পর্যটকদের আনন্দ উল্লাস অবলোকন করে।
ভোলাগঞ্জ সাদাপাথর বাংলাদেশের পর্যটন খাতে নতুন সম্ভবনার হাতছানি দিয়ে ডাকছে। দেশের নানা প্রান্ত থেকেও প্রতিদিন আসছে পর্যটকরা। এই নতুন সম্ভবনাময় পর্যটন কেন্দ্রটিতে হোটেল মোটেলসহ পর্যটকদের নানা সুযোগ সুবিধা সজ্জিত স্থাপনা গড়ে তুলতে পারলে পর্যটন খাতে বিপুল রাজস্ব আয়ের উজ্জল সম্ভবনা রয়েছে। বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন নজর দিলে বিশ্বমানের পর্যটন কেন্দ্র হয়ে উঠবে 'বাংলার কাশ্মীর' ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর।
আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন: 01783952169 (whatsapp)