
পাকিস্তান পেয়েছিল এবং বাকি ৮৩ শতাংশ ব্যয় হয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানে। ব্যাংকের আমানতের মাত্র ৮ শতাংশ পূর্ব পাকিস্তান ও ৯২ শতাংশ পেত পশ্চিম পাকিস্তানের ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরা। কেন্দ্রীয় সরকারের বাজেটের মাত্র ২৮ শতাংশ পূর্ব পাকিস্তান ও ৭২ শতাংশ পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যয় করা হতো। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা বাহিনীতে বাঙালিদের অংশগ্রহণ ছিল মাত্র ৫ শতাংশ। পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থিত ব্যক্তি খাতে শিল্প-কারখানার মালিকানা মাত্র ১১ শতাংশ ছিল বাঙালিদের হাতে, বাকি ৮৯ শতাংশ ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি কিংবা অবাঙালিদের হাতে। বাংলার সম্পদ লুণ্ঠন করে পাকিস্তানের তিনটি প্রধান শহর করাচি, রাওয়ালপিন্ডি ও ইসলামাবাদ নির্মাণ করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় যখন পাকিস্তানি শাসকদের পরাজয় নিশ্চিত হয়ে যায়, তখন বাংলাদেশের অর্থনীতিকে চিরতরে ধ্বংস করার জন্য এ দেশে অবস্থিত প্রায় সব ব্যাংকের ভল্ট ভেঙে দেশীয় অর্থ, সোনা ও বৈদেশিক মুদ্রা পাকিস্তানে পাচার করে নিয়ে যাওয়া হয়।
বাংলাদেশ শূন্য ভাণ্ডার দিয়ে যাত্রা শুরু করে মাত্র ৫০ বছরে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সব সূচকেই পাকিস্তানকে অনেক পেছনে ফেলে দিয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় পাকিস্তানের প্রায় দ্বিগুণ। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাংলাদেশ ৩৪ বিলিয়ন ডলার, পাকিস্তান ৩০৯ কোটি ডলার, যা ১১ গুণেরও বেশি। এক ডলার সমান বাংলাদেশের ১০৭.৩৫ টাকা, অন্যদিকে পাকিস্তানের ২৭৬.৫০ রুপি। অর্থাৎ বাংলাদেশের এক টাকা সমান পাকিস্তানের ২.৫৭ রুপি। বাংলাদেশের টাকা পাকিস্তানি রুপির চেয়ে বর্তমানে আড়াই গুণের বেশি শক্তিশালী। বাংলাদেশের শতভাগ জনগণ বিদ্যুৎ পায়, পাকিস্তানে ৭৩ শতাংশ। বাংলাদেশের জনগণের গড় আয়ু ৭২.৮ বছর, পাকিস্তানের ৬৬ বছর। বাংলাদেশের সাক্ষরতার হার ৭৫ শতাংশ, পাকিস্তানের ৫৯ শতাংশ। বাংলাদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১.২ শতাংশ, অন্যদিকে পাকিস্তানে ২.১ শতাংশ। বাংলাদেশে শিশুমৃত্যুর হার হাজারে ২১ জন, পাকিস্তানে ৫৯ জন। কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ ৩৮ শতাংশ, পাকিস্তানে ২৩ শতাংশ। দারিদ্র্যের হার ২০.৫ শতাংশ, পাকিস্তানে ৪৭ শতাংশ।
বাংলাদেশ শুধু দক্ষিণ এশিয়ার নয়, এশিয়ারই অন্যতম সেরা অর্থনীতির দেশ। অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রতিটি সূচকে পাকিস্তানকে পেছনে ফেলেছে, অনেক ক্ষেত্রে ভারত থেকেও এগিয়ে আছে বাংলাদেশ। পাকিস্তানের অর্থনীতিবিদ, সুধীসমাজ এমনকি রাজনীতিবিদদের প্রায়ই বাংলাদেশের উদাহরণ দিতে দেখা যায়। উন্নয়নের জন্য ‘বাংলাদেশ মডেল’-এর কথা জোর দিয়ে বলা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর মতে, বাংলাদেশ এখন ৩৫তম অর্থনীতির দেশ। ২০৩০ সালে ২৫তম এবং ২০৪১ গিয়ে দাঁড়াবে ২১তম দেশে। ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশের দারিদ্র্য ছিল ৭৫ শতাংশ বেশি, কিন্তু এখন পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ ৪৫ শতাংশ ধনী রাষ্ট্র। পাকিস্তানি অর্থনীতিবিদদের অনেকে মনে করেন, ২০৩০ সালের মধ্যেই বাংলাদেশের কাছে পাকিস্তানের সাহায্য চাইতে হবে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রশংসা করে পাকিস্তানের গণমাধ্যমগুলোতে একাধিক নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে পাকিস্তান সরকারকে শেখ হাসিনার কাছ থেকে শেখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ১৪ বছর ধরে একটি টেকসই প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশকে বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত করেছেন। পাকিস্তানের মধ্যেই আওয়াজ উঠছে সিঙ্গাপুর কিংবা নিউ ইয়র্ক নয়, আমাদের বাংলাদেশ বানিয়ে দাও।
স্বাধীনতার ৫০ বছরে পাকিস্তান থেকে সব সূচকে এগিয়ে থেকে ৩০ লাখ শহীদ ও দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম হারানোর ঋণ কিছুটা হলেও শোধ করতে পেরেছে বাংলাদেশ। অন্যায়, অত্যাচার ও নিপীড়নের ফলাফল কী হতে পারে তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে পাকিস্তান। এটা তাদের কৃতকর্মের ফল।
লেখক : সাবেক ছাত্রনেতা ও সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ
haldertapas80@gmail.com
আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন: 01783952169 (whatsapp)