
ভিন্ন ধরনের এক প্রতিবাদ। সড়কে বাস চলছে। কিন্তু যাত্রী নেই। যাত্রীদের কেউ বাসে উঠছেন না। ভুলে কেউ উঠলে স্থানীয়রা নামিয়ে দিচ্ছে। তবে বাস চলাচলে তারা কোনো বাধা দিচ্ছেন না। যাত্রী ছাড়াই বাস চলাচল করছে। এমন ঘটনা ঘটে চলেছে সিলেটের জৈন্তাপুরে। প্রায় ১৯ বছর আগে একইভাবে টানা ৯০ দিন প্রতিবাদ চলেছিল জৈন্তাপুর রুটে। কোনো যাত্রীই বাসে চড়েননি।
টেম্পো, লেগুনা, অটোরিকশা দিয়ে যাতায়াত করেছিলেন। পরে অবশ্য প্রশাসনের মধ্যস্ততায় ঘটনার নিস্পত্তির পর বাসে উঠেছিলেন যাত্রীরা। এবার গত ৪ দিন ধরে জৈন্তাপুরের ১৭ পরগনার বাসিন্দারা এ প্রতিবাদ শুরু করেছেন। যাত্রীরা বাসের বদলে লেগুনা, সিএনজি অটোরিকশাসহ অন্য যানবাহনে গন্তব্যে যাচ্ছেন। তাদের ক্ষোভ সিলেট জেলা পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের প্রতি। সর্বশেষ ১৩/০৭/২০২৩ বৃহস্পতিবার রাত ১০টা পর্যন্ত ৫ ঘণ্টা বৈঠক হয় জৈন্তাপুরের উপজেলা অডিটোরিয়ামে। ওই বৈঠকেও কোনো সিদ্ধান্ত না হওয়ায় প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অনড় ১৭ পরগনার বাসিন্দারা। জৈন্তাপুরের ১৭ পরগনা। একটি শক্তিশালী সামাজিক কাঠামো। দেশে পরগনার শাসন ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হলেও সিলেটের জৈন্তাপুরে সেটি রয়ে গেছে।
এই পরগনার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট ও কানাইঘাট। সামাজিক নানা ঘটনায় তারা ঐক্যবদ্ধভাবে সিদ্ধান্ত নেন এবং তার বাস্তবায়নও করেন। এতে প্রবীণ মুরুব্বিরা ছাড়াও বর্তমান সময়ের জনপ্রতিনিধিরা নেতৃত্বে রয়েছেন। গত ৭ই জুলাই রাতে জৈন্তাপুরের দরবস্ত বাজারের কাছে একটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। এই দুর্ঘটনায় বাস চাপায় মারা যান খড়িল পরগনার ৫ জন। তারা ছিলেন ইজিবাইকের (টমটম) যাত্রী। দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া ৫ যাত্রীর জানাজার নামাজের পরদিন ৮ই জুলাই দরবস্ত শাহী ঈদগাহ মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে কয়েক হাজার মানুষ উপস্থিত হন। জানাজার নামাজে সিলেট জেলা বাস মালিক কিংবা পরিবহন শ্রমিকদের কেউ-ই উপস্থিত হননি।
এমনকি তারা হাসপাতালে আহতদের দেখতে যাননি। এতে ক্ষুব্ধ হন জৈন্তাপুরের মানুষ। এর জের ধরে ৯ই জুলাই দরবস্ত এলাকার লোকজন বিক্ষুব্ধ হয়ে সকাল ৮টা থেকে জৈন্তাপুরে বাস চলাচলে বাধা দেন। বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসার পর স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মধ্যস্থতায় দুই ঘণ্টা পর বাস চলাচল স্বাভাবিক করা হয়।এ ঘটনায় বেঁকে বসেন পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা। তারা ঘটনার প্রতিবাদে প্রথমে সিলেট-তামাবিল রুটে বাস ধর্মঘট কর্মসূচি শুরু করেন। পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের এই কর্মসূচিতে পাল্টা কর্মসূচি ঘোষণা করেন ১৭ পরগনার বাসিন্দারা।
জৈন্তাপুরে বৈঠক করে তারা ৩ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তাদের ঘোষিত দফাগুলোর মধ্যে রয়েছে- ১. ১৭ পরগনার কাছে ময়নুল ও মালিক সমিতির প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে। ক্ষমা চাওয়ার আগ পর্যন্ত সিলেট টু তামাবিল, সিলেট টু কানাইঘাট এবং সিলেট টু গোয়াইনঘাট সড়কে শুধুমাত্র বাস চলাচল বন্ধ থাকবে। ২. মালিক সমিতি নিজেরাই গাড়ি বন্ধ করেছে তাই ক্ষমা চাওয়ার পর পুনরায় বাস চালাতে চাইলে ১৭ পরগনার অনুমতি নিয়েই চালাতে হবে। ৩. বাস ব্যতীত সকল গাড়ি চলাচল করবে।
যদি চলাচলে কেউ বাধা প্রদান করে তাহলে ১৭ পরগনার আপামর জনতা প্রতিহত করবে। এদিকে- ১৭ পরগনার সিদ্ধান্তে পাল্টা কর্মসূচি দেয় পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা। তারা মঙ্গলবার দুপুরে সিদ্ধান্ত নিয়ে বুধবার থেকে গোটা জেলায় পরিবহন ধর্মঘট আহ্বান করে। এতে হস্তক্ষেপ করে সিলেটের প্রশাসন। রাতে এ নিয়ে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে সভা হয়। এ সভায় পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা নানা বিষয় পর্যালোচনা করে তাদের কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেন। এরপর থেকে জৈন্তাপুর সড়কে যাত্রীবাহী বাস চলাচল করলেও কোনো যাত্রী উঠছেন না।
যাত্রী ছাড়াই বাস চলছে এ সড়কে। কোথাও কোথাও যাত্রী উঠে গেলে স্থানীয়রা তাদের নামিয়ে দিচ্ছেন। এদিকে- জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে মঙ্গলবারের বৈঠকের আলোকে পরিবহন মালিক ও শ্রমিক এবং ১৭ পরগনার সালিশ ব্যক্তিরা মিলে বিষয়টির সমাধানের নির্দেশনা থাকলেও বুধবার কিংবা বৃহস্পতিবার পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের কোনো পক্ষই জৈন্তাপুরে যাননি। তবে- শুক্রবার বিকালে জৈন্তাপুরে ১৭ পরগনার পূর্ব নির্ধারিত বৈঠকে তাদের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে উপস্থিত থাকা ১৭ পরগনার মুরুব্বি চারিকাটা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান তোফায়েল আহমদ চৌধুরী জানিয়েছেন, ‘শুক্রবার বৈঠকে ঘটনাটি সমাপ্ত হওয়ার পথে ছিল। কিন্তু নতুন করে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে মালিক ও শ্রমিকদের দেয়া একটি স্মারকলিপি নিয়ে জট খুলেও খোলেনি। ফের আগামীকাল রোববার বৈঠক আহ্বান করা হয়েছে। ফলে ১৭ পরগনার বাস বর্জন কর্মসূচি বহাল থাকছে। বাস চললেও আমরা কেউ উঠবো না। বাস চলাচলে কোনো বাধা দেবো না।
আজ ১৬/০৭/২০২৩ ইং জৈন্তাপুর ডেফল তলা নামেক স্থানে ১৭ পরগনার হয়ছে, উক্ত বৈঠক কোন সমাধান হয়নি, উক্ত বৈঠকে সিলেট জেলা মেয়র জনাম আনোয়ার উজ্জামান উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে- জৈন্তাপুরের ঘটনায় বৃহস্পতিবার জেলা প্রশাসকসহ ১৫টি দপ্তরে স্মারকলিপি দিয়েছেন সিলেট জেলা বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জিয়াউল কবির পলাশ ও জেলা পরিহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ময়নুল ইসলাম। ওই স্মারকলিপিতে তারা দাবি করেছেন- প্রশাসনের মধ্যস্থতার বিষয়টি আমরা মেনে নিলেও আমাদের গাড়ি অবৈধভাবে থামিয়ে যাত্রীদের নামিয়ে দেয়া হচ্ছে। এতে জৈন্তাপুরে বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি করা হয়েছে বলে জানান তারা। জৈন্তাপুর সড়কে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা ও গাড়ি চলাচল স্বাভাবিক না হলে রোববার তারা নতুন করে কর্মসূচি ঘোষণা করবেন বলে স্মারকলিপিতে উল্লেখ করেছেন।
আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন: 01783952169 (whatsapp)