
চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলায় কৃষকেরা যখন প্রয়োজনীয় সার সংকটে ভুগছেন, ঠিক সেই সময়ে ৪৪০ বস্তা টিএসপি সার অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগে একটি ট্রাক আটক করেছে স্থানীয়রা। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে সারসহ ট্রাকটি জব্দ করে হাঁপানিয়া ক্যাম্পে নিয়ে যায়। রবিবার সকালে চুয়াডাঙ্গা–হাটবোয়ালিয়া সড়কের চিৎলা বাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
আটক ট্রাকটির নম্বর ঝিনাইদহ-ট-১১-১১৪৫। স্থানীয়দের অভিযোগ, চুয়াডাঙ্গা বিএডিসির গোডাউন থেকে বরাদ্দকৃত বিপুল পরিমাণ টিএসপি সার বৈধ কাগজপত্রের আড়ালে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হচ্ছিল। একসঙ্গে ৪৪০ বস্তা সার পরিবহনের ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, ট্রাকটি চিৎলা বাজার এলাকায় পৌঁছালে সন্দেহ হলে স্থানীয়রা সেটি আটক করেন। খবর পেয়ে হাঁপানিয়া ক্যাম্প পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ট্রাক ও সার জব্দ করে ক্যাম্পে নিয়ে যায়।
ট্রাকের সঙ্গে থাকা একটি চালানে পণ্যের বিবরণে ‘TSP’ সার এবং পরিবহনের পরিমাণসহ বিভিন্ন তথ্য হাতে লেখা রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, চালানে উল্লেখিত তথ্যের সঙ্গে আটক সার, ট্রাকের গন্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্যের মধ্যে অসঙ্গতি রয়েছে। এ কারণে চালানটির বৈধতা এবং সার পরিবহনের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
আটক সারগুলো আলমডাঙ্গা উপজেলার ভাংবাড়িয়া ইউনিয়নের মুদি ব্যবসায়ী মিনারুল ইসলামের বলে জানা গেছে। সার আটকের পর মিনারুল ইসলাম দাবি করেন, সারগুলো যশোরের নওয়াপাড়া থেকে ট্রাকে করে আনা হচ্ছিল। ইউনিয়নের কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী সার সরবরাহ করা সম্ভব না হওয়ায় নওয়াপাড়া থেকে সার এনে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছিল বলেও তিনি জানান।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি ব্যবস্থাপনায় কৃষকদের জন্য বরাদ্দকৃত সার এভাবে অন্যত্র থেকে এনে মজুত বা সরবরাহ করা হলে এর বৈধতা এবং বিতরণব্যবস্থা নিয়ে তদন্ত প্রয়োজন। বিশেষ করে কৃষকেরা স্থানীয়ভাবে সার না পাওয়ার অভিযোগ করার সময় বিপুল পরিমাণ সার একসঙ্গে পরিবহনের বিষয়টি নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে আরও জানা গেছে, এর আগেও ভাংবাড়িয়া ইউনিয়নের মিনারুল স্টোর থেকে বিপুল পরিমাণ সার উদ্ধার করেছিল উপজেলা কৃষি অফিস। স্থানীয়দের অভিযোগ, অনুমোদিত ডিলার পয়েন্টে থাকার কথা যে পরিমাণ সার, তার তুলনায় বেশি পরিমাণ সার ওই ব্যবসায়ীর গোডাউনে মজুত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, ওই গোডাউনে মজুত সার শুধু ভাংবাড়িয়া ইউনিয়নের কৃষকদের মধ্যে সরবরাহ না করে আশপাশের বিভিন্ন এলাকা ও জেলায় সরবরাহ করা হয়ে থাকে। এর সঙ্গে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা বড় কোনো সার সরবরাহকারী চক্র জড়িত কি না, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে আলমডাঙ্গা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাসুদ পলাশ জানান, মিনারুল ইসলামকে এর আগেও একাধিকবার মুচলেকা দিতে হয়েছে এবং জরিমানাও করা হয়েছে। তবে এবারের ৪৪০ বস্তা টিএসপি সার আটকের ঘটনায় সারগুলোর উৎস, পরিবহনের বৈধতা ও সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না—তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের পরই স্পষ্ট হবে।
এদিকে, কৃষকদের অভিযোগ—বাজারে বা অনুমোদিত বিক্রয়কেন্দ্রে প্রয়োজনের সময় সার পাওয়া যাচ্ছে না। সার সংকটকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ, হাতাহাতি এমনকি গুদামে হামলা ও লুটের মতো ঘটনাও ঘটছে। এমন পরিস্থিতিতে বিপুল পরিমাণ সার একসঙ্গে অন্যত্র পরিবহনের ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই কৃষক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, শুধু ট্রাক আটক করে বিষয়টি শেষ না করে ৪৪০ বস্তা টিএসপি সারের উৎস, বরাদ্দ, চালান, পরিবহন, গন্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্ত করা হোক। একই সঙ্গে অতীতে একই ব্যবসায়ীর গোডাউন থেকে সার উদ্ধারের অভিযোগের বিষয়টিও খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তারা।
তদন্তে সার সরবরাহের সঙ্গে কোনো সিন্ডিকেট, প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা সরকারি-বেসরকারি কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসূত্র পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে। কৃষকদের জন্য বরাদ্দকৃত সার যেন কোনোভাবেই অবৈধ মজুত, কৃত্রিম সংকট বা পাচারের মাধ্যমে বাজারের বাইরে চলে না যায়—এ জন্য কার্যকর নজরদারি জোরদারের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন: 01783952169 (whatsapp)