
মন্দিরের সম্পত্তি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন বাড়ি দখলের অভিযোগকে কেন্দ্র করে বরিশালের উজিরপুরে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুজ্জামান শেখের বিরুদ্ধে বাড়ি দখল, ভাঙচুর ও মালামাল লুটের অভিযোগ তুলেছেন বরুন মিত্র নামের এক ব্যক্তি। অভিযোগের আরও গুরুতর দিক হলো, বাড়িসংলগ্ন মন্দিরের পাকা ফটকে ‘খান বাড়ি’ লিখে প্লাস্টার করে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি।
নিজের কেনা জমি ও মন্দিরের কাজে ব্যবহৃত অংশ ফিরে পেতে উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ, স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং বিএনপি নেতাদের কাছে একাধিকবার ধরনা দিয়েও প্রতিকার পাননি বলে অভিযোগ বরুন মিত্রের। আগের সাধারণ ডায়েরিতে প্রতিকার না মেলায় গতকাল রোববার উজিরপুর মডেল থানায় নতুন করে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন তিনি। এবার বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন ভুক্তভোগী।
অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। পুলিশও অভিযোগ পাওয়ার পর ঘটনাস্থলে সদস্য পাঠানোর কথা জানিয়েছে। তবে অভিযুক্ত নুরুজ্জামান শেখের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
নিজের টাকায় বাড়ি, মন্দিরের কাজে ব্যবহারের জন্য একাংশ দান
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উজিরপুর পৌর এলাকার বাসিন্দা বরুন মিত্র ২০১৯ সালে কেন্দ্রীয় কীর্তন আঙ্গিনা ও শ্রীগুরু মন্দিরসংলগ্ন এলাকায় শহিদুল ইসলামের কাছ থেকে চার শতক জমি কেনেন। পরে সেখানে নির্মাণ করেন দ্বিতল ভবন। বাড়ির একটি অংশ ভাড়া দেওয়া হয়। অন্য অংশটি মন্দিরের ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও আনুষঙ্গিক কার্যক্রমে ব্যবহারের জন্য রেজুলেশনের মাধ্যমে দান করা হয়েছে বলে দাবি বরুন মিত্রের।
প্রতিবছর মন্দিরের বার্ষিক কীর্তনসহ বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সেখানে মানুষের সমাগম ঘটে। অনুষ্ঠান আয়োজন এবং আগতদের প্রয়োজনে ভবনটির একাংশ ব্যবহার করা হতো বলে জানান তিনি।
বরুন মিত্রের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে তাঁর অনুপস্থিতিতে নুরুজ্জামান শেখ লোকজন নিয়ে বাড়িটিতে হামলা চালান। ভাঙচুরের পাশাপাশি মালামাল লুট এবং ভাড়াটিয়াদের মারধর করে বের করে দেওয়ার পর বাড়িটি দখলে নেওয়া হয় বলে দাবি তাঁর। তবে ঘটনার বিষয়ে অভিযুক্তের বক্তব্য পাওয়া না যাওয়ায় অভিযোগগুলোর স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।
‘দলিল আমার নামে, তবু বাড়িতে ফিরতে পারছি না’
বরুন মিত্র জানান, ব্যবসায়িক ও পারিবারিক কারণে ২০২৪ সালের শুরুর দিকে তিনি বরিশাল নগরীতে বসবাস শুরু করেন। এই সুযোগে তাঁর সম্পত্তি দখল করা হয়েছে বলে অভিযোগ তাঁর।
তিনি বলেন, জমির দলিল, খাজনা পরিশোধের কাগজপত্র ও বিএস পর্চাসহ প্রয়োজনীয় নথি তাঁর কাছে রয়েছে। তা সত্ত্বেও বাড়ি ফিরে পেতে তাঁকে বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরতে হচ্ছে।
বরুন মিত্রের ভাষ্য, ঘটনার পরপরই পুলিশকে জানানো এবং থানায় সাধারণ ডায়েরি করার পরও সমস্যার সমাধান হয়নি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনারের (ভূমি) কাছেও বিষয়টি তুলে ধরেছেন। স্থানীয় বিএনপি নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেও কার্যকর ফল পাননি বলে দাবি করেন তিনি।
তাঁর আরও দাবি, বাড়ি ও মন্দিরে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরায় ভাঙচুরের দৃশ্য ধারণ হয়েছে এবং সেই ভিডিও তাঁদের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের পরিবার ওই সম্পত্তি ভোগদখল করে আসছে।
বিএনপি নেতাদের বক্তব্যেও দখলের অভিযোগ
উজিরপুর পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. রোকনুজ্জামান টুলু বলেন, বরুন মিত্রের বাড়িটি অন্যায়ভাবে দখল করা হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। রাজনৈতিক দলের নাম ব্যবহার করে এ ধরনের কর্মকাণ্ড চললে দলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তিনি জানান, বাড়ি ও মন্দিরের জায়গা নিয়ে বিরোধের বিষয়টি স্থানীয় সংসদ সদস্যকে অবহিত করা হয়েছে। সংসদ সদস্য বিষয়টি দেখবেন বলে জানিয়েছেন।
রোকনুজ্জামান টুলু আরও অভিযোগ করেন, নুরুজ্জামান শেখের বিরুদ্ধে অন্যের সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের অভিযোগ আগেও উঠেছিল। উজিরপুর মহিলা কলেজের জায়গা নিয়েও বিরোধের কথা উল্লেখ করেন তিনি। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথি ও অভিযুক্তের বক্তব্য পাওয়া গেলে বিষয়গুলো আরও স্পষ্ট হবে।
উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. শাহীন হাওলাদারও বরুন মিত্রের বাড়ি দখলের অভিযোগের কথা স্বীকার করে বলেন, বাড়িটি উদ্ধারের জন্য তাঁরা বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের অসহযোগিতাও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
‘দখলমুক্ত না হওয়া দুঃখজনক’
স্থানীয় বাসিন্দা অধ্যক্ষ মিজানুর রহমানের দাবি, বরুন মিত্র ক্রয়সূত্রে ওই সম্পত্তির মালিক। একই খতিয়ানের ৮২ শতক জমি ১২টি পরিবার ভোগদখল করছে বলেও জানান তিনি।
মিজানুর রহমান বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের সময় বরুন মিত্র বাড়িতে না থাকার সুযোগে তাঁর বাড়িটি দখল করা হয়েছে বলে তাঁরা জানেন। কারও সম্পত্তি দখলের অভিযোগ ওঠার পরও সমাধান না হওয়া দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তাঁর অভিযোগ, নুরুজ্জামান শেখকে ঘিরে এলাকায় অসন্তোষ রয়েছে। তবে এসব বক্তব্যের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি ও উভয় পক্ষের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।
আদালতে মামলা থাকায় পুলিশের এখতিয়ার সীমিত: ওসি
উজিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রকিবুল ইসলাম বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। তবে সেখানে অভিযোগকারীকে পাওয়া যায়নি।
ওসি জানান, তাঁর জানা মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বাড়িটি দখলের ঘটনা ঘটে। জমি নিয়ে আদালতে মামলা থাকায় এ বিষয়ে পুলিশের করণীয় সীমিত বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তবে বরুন মিত্রের দাবি, শুধু জমি নিয়ে বিরোধ নয়, বাড়ি ভাঙচুর ও মালামাল লুটের অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে আইনানুগ পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
তদন্তের আশ্বাস উপজেলা প্রশাসনের
উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলী সুজা বলেন, বরুন মিত্র বাড়ি দখলের বিষয়ে আগেই অভিযোগ করেছিলেন। সম্পত্তির দখল নিয়ে রাজনৈতিকভাবে বিভিন্ন পক্ষের অবস্থান থাকায় বাড়িটি দখলমুক্ত করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে বলে জানান তিনি।
তবে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।
এদিকে, বাড়ি ও মন্দিরের সম্পত্তি দখলের অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুজ্জামান শেখের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।
এখন প্রশ্ন উঠেছে—জমির মালিকানা ও মন্দিরের সম্পত্তি ব্যবহারের নথি যাচাই করে বিরোধের নিষ্পত্তি হবে কবে? অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, সিসিটিভি ফুটেজ যাচাই এবং আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন বরুন মিত্র।
আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন: 01783952169 (whatsapp)