
কুন্ডা ইউনিয়নের তিতাস পাড়ের বাসিন্দা নরেশ চন্দ্র দাস। একটি এনজিও থেকে ছয় লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ৯টি পুকুরে মাছ চাষ করেছিলেন। পুকুরে ছিল বেশ কিছু প্রজাতির বড় মাছ ও পোনা। সেই পুকুরের মাছ বিক্রি করে এনজিওর ঋণ শোধ করে পরিবার নিয়ে সুখে থাকার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু বন্যার পানিতে ভেসে গেছে ছয়টি পুকুরের মাছ, সাথে ভেসে গেছে পরিবার নিয়ে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্নটুকুও। এখন এনজিও থেকে ঋণ আনায় প্রতিমাসে ৪৫ হাজার টাকা কিস্তি দেবেন কীভাবে, সেই চিন্তার ভাঁজ নরেশের কপালে।
সম্প্রতি ভারী বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা পানির কারণে সৃষ্ট বন্যায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের মেঘনা ও তিতাসসহ বেশ কিছু নদীর পানি ফুঁসে উঠেছে। নরেশ চন্দ্র দাসের মতো উপজেলার আরো ৭০০ পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। মাছ চাষিদের দাবি ক্ষতির পরিমাণ কয়েক কোটি টাকা হবে।
মাছ চাষিরা বলছেন, কিছু বুঝে উঠার আগেই বন্যার পানি সব পুকুরের মাছ ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। ভাঙা মনকে সান্ত্বনা দিতে পুকুরের চারপাশে জালের বেড়া দিচ্ছেন অনেক চাষি, যদি কিছু মাছ রক্ষা করা যায়।
তরুণ মাছচাষি বিদেশ ফেরত মো. জিয়া চৌধুরী বলেন, বিদেশে কষ্ট করে যে টাকা ইনকাম করছিলাম, সেই টাকা দিয়ে ১০টি পুকুর লিজ নিয়ে মাছচাষ করছিলাম। কিন্তু কপাল এত খারাপ যে, কষ্টের সেই টাকা পানিতে ভেসে গেছে। এখন আমি রাস্তায় ঘোরা ছাড়া আর কোনো উপায় নাই।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ভারী বৃষ্টিপাত আর উজানের ঢলে পানি বৃদ্ধি পেয়ে অধিকাংশ ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল তলিয়ে গেছে। এতে ওই এলাকার পুকুরে পানি ঢুকে পুকুরের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। মৎস্য অফিসের তথ্য মতে, উপজেলায় মোট পুকুরের সংখ্যা প্রায় তিন হাজার। এর মধ্যে সোমবার দুপুর পর্যন্ত উপজেলার প্রায় পাঁচ শতাধিক পুুকুরের মাছ ভেসে গেছে। তবে পানি বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে এ ক্ষতির পরিমাণ কয়েকগুণ হতে পারে। এসব পুকুরে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও পোনা ছিল। টাকার অঙ্কে এ ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ছয় কোটি টাকা।
আরও জানা গেছে, উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নে ৫০টি, চাপরতলা ৯০টি, ধরমন্ডলে ১২০টি, গোকর্ণ ইউনিয়নের ২০টি, কুন্ডা ইউনিয়নে ৪০টি, ভলাকুট ইউনিয়নের ৯০টি, ফান্দাউকে ৩০টি, নাসিরনগরে ১২০টি, চাতলপাড়ে ৩০টি ও বুড়িশ্বরে ১২০টি পুকুরের মাছ ও পোনা ভেসে গেছে।
বুড়িশ্বর ইউনিয়নের মাছচাষি রতন সাহাজি বলেন, ‘খুব কষ্ট কইরা চাইরটা পুকুরে মাছ চাষ করছিলাম। কিন্তু সব পানির নিচে গেছেগা। একটা মাছও ধরতাম পারছি না। আমার প্রায় ছয় লাখ টাকার মাছ ভাইস্যা গেছে।’
মৎস্যজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক পরিমল চন্দ্র দাস বলেন, বন্যার কারণে মৎস্যজীবী মানুষজন খুব ক্ষতির শিকার হয়েছে। এরই মধ্যে উপজেলার নিম্নাঞ্চলের সবকটি পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। সরকারিভাবে কোনো প্রণোদনা না পেলে জেলেদের বেঁচে থাকাটা কষ্টকর হবে।
উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা শুভ্র সরকার বলেন, পানি বৃদ্ধির যে হার সেটা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে উপজেলার সবকটি পুকুর পানির নিচে তলিয়ে যাবে। এই পর্যন্ত ১৩টি ইউনিয়নের মাছ চাষিদের দেওয়া তথ্য মতে প্রায় ৭০০ পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। যার ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১২ কোটি টাকা। তবে এর পরিমাণ বাড়তে পারে বলে তিনি যোগ করেন।
আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন: 01783952169 (whatsapp)