
বাংলাদেশ পেট্রোল শতভাগ এবং অকটেনের অধিকাংশ অংশ নিজস্ব খাতে উৎপাদনের পরও কেনো দেশের বাজারে অকটেন ও পেট্রোলের মূল্য বেড়েছে তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে বিতর্ক। অনেকেই বলছেন, বাংলাদেশে অকটেন ও পেট্রোল উৎপাদন হয় না। আবার অনেকে প্রশ্ন তুলছেন, দেশে অকটেন-পেট্রোল উৎপাদন হলে কোনভাবেই এর দাম বাড়তে পারে না। কিন্তু সত্যটা কী?
দেশের বিভিন্ন আঙ্গনের বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যমতে, সরকারের আরও আগে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো উচিত ছিলো, কিন্তু তা ধীরে। অন্যদিকে সরকারের ভাষ্যমতে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য কিছুটা কমার পর স্থানীয় বাজারে সমন্বয় করেছে সরকার। কিন্তু এই বিতর্ক ছাপিয়ে গেছে পেট্রোল ও অকটেনের মূল্য বৃদ্ধি নিয়ে চলমান বিতর্ক। প্রশ্ন হলো তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো কী নিজেদের দেশে বাড়ায়নি তেলের দাম?
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের ভাষ্যানুসারে, রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধের ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানির বাজারে যে অস্থিরতা তার ভিকটিম হয়েছে বাংলাদেশ। সেই পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য ছয় মাস অপেক্ষার পরও যুদ্ধ থামার কোনও ইঙ্গিতই যখন মিলছে না তখন দাম না বাড়িয়ে বাংলাদেশের সামনে কোনও বিকল্প ছিল না। শুধু উন্নত বিশ্বই নয়, আমাদের প্রতিবেশি দেশ ভারতে প্রতিদিন জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় হয়। সেখানে গত ছয় মাস ধরেই দাম উর্দ্ধমুখী। আমাদেরও যদি অটোমেটিক সমন্বয় করার সিস্টেম চালু থাকতো তাহলে প্রতিদিন দাম বাড়তে বাড়তে এরইমধ্যে বর্তমানের চেয়েও বেশি দামে কিনতে হতো।
সবার আগে আমরা দেখে আসি বিশ্বের শীর্ষ জীবাশ্ম জ্বালানী উৎপাদনকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, সৌদি আরব, কানাডা ও চীনের বাজারে খুচরা পর্যায়ে জ্বালানির দাম কেমন?
বিশ্বের সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ মোট জীবাশ্ম জ্বালানির প্রায় ২০ শতাংশ উৎপাদন করে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটিতে ২৫ এপ্রিল থেকে ১লা অগাস্ট সময়ে প্রতি লিটার অকটেনের গড় দাম ছিল ১ ডলার ২৭ সেন্ট। ডলারের বিনিময় ১০০ টাকা ধরলে এই দাম দাঁড়াচ্ছে ১২৭ টাকা। এ সময়ে সর্বোচ্চ ছিল ১ ডলার ৩৭ সেন্ট মানে ১৩৭ টাকা। গত ১ লা অগাস্ট যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১ দশমিক ৩৫ সেন্ট বা ১৩৫ টাকা।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ফসিলস ফুয়েল উৎপাদক রাশিয়াতে নিয়ন্ত্রণমূলক বাজার থাকায় সেখানেও দাম একদম কম না। পহেলা আগস্ট রাশিয়ার বাজারে প্রতি লিটার ডিজেল দশমিক ৮৪ সেন্ট বা ৮৪ টাকা এবং অকটেন দশমিক ৮২ সেন্ট বা ৮২ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
সৌদি আরবে ডিজেলের মূল্য কিছুটা কম থাকলেও অকটেনের দাম চারগুণ বেশি। পহেলা আগস্ট সেখানে প্রতি লিটার ডিজেলের খুচরা দাম ছিল দশমিক ১৬ সেন্ট বা ১৬ টাকা এবং অকটেনের দাম ছিল দশমিক ৬২ সেন্ট বা ৬২ টাকা।
কানাডার বাজার আরও চড়া। একইদিন সেখানে ডিজেল ১ ডলার ৪৭ সেন্ট বা ১৪৭ টাকা এবং প্রতি লিটার অকটেন বিক্রি হয়েছে ১ ডলার ৫৫ সেন্ট বা ১৫৫ টাকায়।
একই সময়ে চীনে প্রতি লিটার ডিজেল ১ ডলার ২১ সেন্ট বা ১২১ টাকা এবং অকটেন ১ ডলার ৩৫ সেন্ট বা ১৩৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
তাহলে বিশ্বের শীর্ষ জ্বালানি তেল উৎপাদনকারী দেশেও অকটেনের দাম বাড়ছে কেন? চাইলেইতো তারা মানুষকে বিনামূল্য বা উত্তোলন খরচটুকু রেখে স্বল্পমূল্যে দিতে পারে। কিন্তু তা দিচ্ছে না কেন?
বাংলাদেশ যে শতভাগ পেট্রোল ও ৪০ ভাগ অকটেন উপাদন করে এ তথ্য আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। এখন আসি বাংলাদেশের পেট্রোলিয়াম রফতানি করার বিষয়ে।
গত ১১ বছরে (২০১০-২০১১ অর্থবছর থেকে ২০২০-২০২১ অর্থবছর) বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) থেকে ন্যাপথা রফতানি হয়েছে ৭ লাখ ৭৯ হাজার ৬৫৩ টন। এরমধ্যে ২০২০-২০২১ অর্থবছরে রফতানি হয়েছে ১৮ হাজার ৭৯৫ টন। ন্যাপথা থেকে বিভিন্ন পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য উৎপাদিত হয়। বর্তমানে দেশে স্থাপিত বিভিন্ন বেসরকারি পেট্রোকেমিক্যাল প্ল্যান্টে জ্বালানি তেল ও অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদন শুরু হওয়ায় কাঁচামাল হিসেবে ন্যাফথা সরবরাহ করা হচ্ছে। ২০১২-২০১৩ অর্থবছর থেকে গত ৮ বছরে রফতানির পাশাপাশি স্থানীয় জ্বালানি তেল ও অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদকদের বিপিসি থেকে ন্যাপথা সরবরাহ করা হয়েছে ৬ লাখ ২৮ হাজার ৭৯৯ টন।
সুতরাং এটি স্পষ্ট যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যেই বক্তব্যটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে বাংলাদেশের পেট্রোল রফতানি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে তা এক ধরণের গুজব। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেই বক্তব্য প্রদান করেছেন তা শতভাগ সঠিক। কেননা আসলেই বাংলাদেশ পেট্রোল উৎপাদন করে নিজের চাহিদা মিটিয়ে রফতানি করছে। প্রশ্ন হলো, পেট্রোলের মূল্য কেনো বাড়ানো হলো?
বিশ্ববাজারে জ্বালানি আমদানির মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় আমদানি ও দেশের বাজারে বিক্রয়মূল্যের কিছুটা ভারসাম্য আনার লক্ষ্যে চলতি মাসের ৫ তারিখ থেকে বাংলাদেশে বিভিন্ন জ্বালালি তেলের বিক্রয়মূল্য বৃদ্ধি করা হয়। আমদানী ব্যায় ও বিক্রয় মূল্যের মধ্যে ব্যাপক ফারাক থাকায় গত ৬ মাসে বিপিসিকে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে।
এক ব্যারেল ক্রুড অয়েল পরিশোধিত করে আমরা মাত্র ২০% গ্যাসোলিন বা ডিজেল পেয়ে থাকি। বাকি অংশ থেকে আমরা পেট্রোল/নাফথা, অকটেন, মোবিল ইত্যাদি উৎপাদন করি। আমাদের রিফাইনারী বা পরিশোধনাগারে আমরা সর্বোচ্চ ১৫ লাখ টন ক্রুড অয়েল পরিশোধন করতে পারি। আর তা থেকে মাত্র ৩ লাখ টন ডিজেল উৎপাদিত হয়। বাদ বাকি দ্রবন থেকে অন্যান্য পেট্রোলিয়ামজাত দ্রব্য উৎপাদিত হয়। আমাদের ডিজেলের চাহিদা বছরে প্রায় ৫০ লাখ টন। তাই আমাদের নিজস্ব উৎপাদিত তিন লাখ টনের বাইরে বাকি প্রায় ৪৫/৪৭ লাখ টন পরিশোধিত ডিজেল আমাদের বহির্বিশ্ব থেকে আমদানী করতে হয়। কিন্তু মাঝে মাঝে আমাদের উৎপাদিত পেট্রোলিয়ামের (পেট্রোল/নাফথা ইত্যাদি) উৎপাদন বা মজুদ বেড়ে গেলেই তা আবার রফতানি করতে হয়। কারণ মজুদ কমিয়ে যথাসম্ভব উৎপাদন চালিয়ে যাওয়ার জন্য রিজার্ভার প্রয়োজন।
বাংলাদেশে ৭ লাখ টন পেট্রোল ও অকটেন ব্যবহৃত হয় প্রতিবছর। যার অধিকাংশ ব্যবহারকারী মধ্য ও উচ্চবিত্ত। বরাবরই ডিজেলের থেকে পেট্রোল ও অকটেনের মূল্য বেশি ছিলো। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ২০২১ সাল ৩ নভেম্বর ব্যতীত প্রতিবারই ডিজেলের মূল্য বাড়ানোর পর তার থেকে পেট্রোল ও অকটেনের মূল্য বেশি রাখা হয়।
২০১৩ সালে ডিজেলের সাথে অকটেন এর মূল্যের ব্যবধান ছিল লিটার প্রতি ৩১টাকা এবং পেট্রোল এর ব্যবধান ছিল ২৮টাকা। ২০১৬ সালে ডিজেল এর সাথে অকটেন এর মূল্যের ব্যবধান ছিল লিটার প্রতি ২৪ টাকা এবং পেট্রোল এর ব্যবধান ছিল ২১ টাকা। ৩ নভেম্বর ২০২১ তারিখে যখন ডিজেল এর দাম বৃদ্ধি করা হয় তখন অকটেন/পেট্রোল এর দাম বৃদ্ধি করা হয়নি। বর্তমানে ডিজেল এর সাথে অকটেন ও পেট্রোল এর দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে। এক্ষেত্রে ডিজেল এর সাথে অকটেন এর ব্যবধান লিটার প্রতি ২১ টাকা এবং পেট্রোল এর ব্যবধান লিটার প্রতি ১৬ টাকা যা পূর্বের তুলনায় কম বাড়ানো হয়েছে।
অকটেন ও পেট্রোল অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা হয়। দেশে অকটেন ও পেট্রোল মূলতঃ ইস্টার্ণ রিফাইনারির ক্রুড অয়েল ও ন্যাফথা থেকে এবং পেট্রোবাংলার কনডেনসেট থেকে উৎপাদিত হয়ে থাকে।
অকটেন ও পেট্রোলের কাঁচামাল ক্রুড অয়েল আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। আর সে কারণেই ক্রুড অয়েলের দাম বৃদ্ধি পেলে অকটেন ও পেট্রোলের দামও বৃদ্ধি পাবে। সম্প্রতি অকটেন ও পেট্রোল এর চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় স্থানীয়ভাবে অকটেন/পেট্রোল উৎপাদনের কাঁচামাল ন্যাফথা ও কনডেনসেট বেসরকারি পর্যায়ে আমদানির অনুমতি দেয়া হয়। আমদানিকৃত উক্ত ন্যাফথা ও কনডেনসেট থেকে স্থানীয়ভাবে অকটেন ও পেট্রোল উৎপাদন করা হলে এর মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারে অকটেন এর প্লাটস-এ প্রকাশিত মূল্যের উপর ভিত্তি করে পরিশোধের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
সুতরাং অকটেন ও পেট্রোল এই দুটি পণ্যের কাঁচামাল ক্রুড অয়েল/ন্যাফথা/কনডেনসেট আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় অকটেন ও পেট্রোল এর স্থানীয় মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সম্পর্কিত।
#বাংলাদেশ #জ্বালানী #অকটেন #পেট্রোল #যুক্তরাষ্ট্র #সৌদিআরব #কানাডা #রাশিয়া #ইউক্রেন
আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন: 01783952169 (whatsapp)