
শেখ মাসুম বিল্লাহ,ডুমুরিয়া (খুলনা) প্রতিনিধি
ডুমুরিয়ার গুটুদিয়ায় নিরব মন্ডল(১৩) নামে এক স্কুলছাত্রকে ফিল্মি স্টাইলে হত্যা করা হয়েছে। একই স্কুলের ৫ কিশোর গ্যাং এ হত্যার সাথে জড়িত। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে বিদ্যালয়ের পরিত্যক্ত কক্ষে এ হত্যাকান্ডটি ঘটানো হয়। টিভি সিরিয়াল ক্রাইম পেট্রোল দেখেই খুনের পরিকল্পনার ১ মাসের মাথায় হত্যাকান্ড সম্পন্ন করা হয়। নিহত নিরব উপজেলার গুটুদিয়া গ্রামের শেখর মন্ডলের ছেলে এবং গুটুদিয়া অক্কুর চন্দ্র গোলদার বান্ধব মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। ডুমুরিয়া থানা পুলিশ নিহতের মরদেহ উদ্ধার ও হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত সরঞ্জামসহ ঘাতক ৫ জনকে আটক করেছেন। থানা পুলিশ ও এলাকাবাসীর সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। গত বৃহস্পতিবার দুপুর পৌনে ২টার দিকে উপজেলার গুটুদিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৭ম শ্রেণির ছাত্র নিরব মন্ডলকে মেরে ফেলা হয়। ওই বিদ্যালয়ের ৫ শিক্ষার্থী সংঘবদ্ধ হয়ে তাকে হত্যা করে। সংঘবদ্ধ ওই ৫ জন হলো নবম শ্রেণির ছাত্র মৃত সৈয়দ মোল্লার ছেলে সোহেল মোল্লা (১৫), জিলেরডাঙ্গা গ্রামের পংকজ মন্ডলের ছেলে পিতু মন্ডল (১৪), গুটুদিয়া গ্রামের প্রকাশ রায়ের ছেলে ১০ম শ্রেণির ছাত্র হিরক রায় (১৫), তেলিখালী গ্রামের অনিমেশ রায়ের ছেলে ১০ম শ্রেণির ছাত্র পিয়াল রায় (১৫) ও গুটুদিয়া গ্রামের ক্ষিতিশ মন্ডলের ছেলে ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র দ্বীপ মন্ডল (১৩)।
জানা গেছে, সংঘবদ্ধ এই ৫ কিশোর ভারতীয় টিভি সিরিয়াল ক্রাইম পেট্রোলের প্রতি বেশি আসক্ত ছিল। আর ওই স্টাইল কাজে লাগিয়ে নেমে পড়ে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়ার ধান্দায়। আর ওই চক্রটি প্রথমেই বেছে নেয় স্কুলের সহজ সরল শিক্ষার্থী নিরব মন্ডলকে। তাদের সাথে নিরবের বিরোধের সূত্রপাত ঘটে স্কুলের ভিতরে সিগারেট খাওয়া নিয়ে। ওই সূত্র ধরেই নিরবের সাথে তাদের দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এক মাস আগে থেকেই ওরা তাকে হত্যা ও জিম্মি করে টাকা আদায়ের ফন্দি করে। এক পর্যায়ে গত বৃহস্পতিবার ছুটির পরে ওই দলের সদস্য দ্বীপ মন্ডল কৌশলে নিরবকে স্কুলের পেছনে একটি পরিত্যক্ত ঘরে ডেকে নিয়ে যায়। সেখানে অবস্থান করছিল অন্য চারজন। এরপর কথা আছে বলেই জাপটে ধরে তার গলায় রশি পেঁচিয়ে ঘরের ডাবার সাথে ঝুলিয়ে তাকে হত্যা করে। কিছুক্ষণ পরে তার মৃত্যু নিশ্চিত জেনে মরদেহ নামিয়ে ওই ঘরের কোণায় পুরনো কাপড় চোপড়ের মধ্যে লুকিয়ে রেখে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। এদিকে নিহত নিরব মন্ডলের বাড়ি ফিরতে দেরি দেখে তার স্বজনরা খোঁজাখুঁজি শুরু করে। এরই মধ্যে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে একটি মোবাইল ফোন দিয়ে পিতা শেখর মন্ডলের নিকট ছেলে ফেরত দেয়ার কথা বলে ৩০ লাখ টাকা চাঁদা চায় ওই চক্রটি। এরপর বিষয়টি নিয়ে থানা পুলিশকে অবহিত করা হয়। থানা পুলিশ ওই মোবাইল ফোনের সূত্র ধরেই নেমে পড়েন উদ্ধার অভিযানে। পুলিশ মোবাইল ট্র্যাকিং সহ অত্যাধুনিক প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে রাত সাড়ে ৯টার দিকে একজনকে শনাক্ত করতে সক্ষম হন। এরপর একে একে ৫ জনই পুলিশের জালে ধরা পড়ে এবং তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাত সাড়ে ১২টার দিকে স্কুলের ওই পরিত্যক্ত ঘর থেকে নিরবের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। রাতেই ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বি সার্কেল মহসীন আল মুরাদ পরিদর্শন করেন। গুটুদিয়া এসিজিবি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শংকর প্রসাদ মন্ডল বলেন, নিরব মন্ডল নিহতের ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক। এটা কোন ভাবেই মেনে নেয়া যায় না। সে নিয়মিত স্কুলে আসতো। তবে ওই ছেলেগুলো ভালো ছিল না। ওদের চলাফেরা ও পড়ালেখার লক্ষণ সন্তোষজনক ছিল না।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আরও বলেন, স্কুল ছুটির পর সাড়ে ৪টার দিকে নিরবের বাবার কাছ থেকে খবর পাওয়ার পর থানার ওসি সাহেবকে জানাই। পুলিশ রাত ১টার দিকে ১০ম শ্রেণির পিয়ালের স্বীকারোক্তি মোতাবেক স্কুলের পেছনে একটি পরিত্যক্ত ঘর থেকে ময়লা-আবর্জনায় ঢাকা নিরব’র মরদেহ উদ্ধার করেন। নিহত নিরবের শোকাহত বাবা শেখর মন্ডল কাঁদতে কাঁদতে বলেন, আমার সন্তানকে যারা হত্যা করেছে আমি তাদের দৃষ্টান্তমূলক চরম শাস্তি চাই। ডুমুরিয়া থানা অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সেখ কনি মিয়া (বিপিএম) সাংবাদিকদের বলেন, ৩০ লাখ টাকা মুক্তিপণের দাবিতে স্কুলছাত্রকে আটকে রাখা হয়েছে, এমন অভিযোগ পেয়ে আমরা মাঠে নেমে পড়ি। অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে থানার সকল অফিসার কাজ শুরু করে এবং রাত সাড়ে ৯টার মধ্যে খুনীদের আটক করা হয়। আর তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাত সাড়ে ১১টার মধ্যে মরদেহ উদ্ধার ও হত্যার কাজে ব্যবহৃত দড়ি, মোবাইল ফোন ও সিম জব্দ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, হত্যাকান্ড নিয়ে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, এরা টিভি সিরিয়াল ক্রাইম পেট্রোল দেখে এ ধরনের দুঃসাহসিক কাজ করেছে। যা দেখে তারা টাকা আয়ের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। ওসি আরও বলেন এ গ্যাংটি টাকা পাওয়ার আশায় গত এক-দেড় মাস ধরে চেষ্টা করছিলো। গত সরস্বতি পূজার সময়ও এরা একবার চেষ্টা করেছিলো। এই ঘটনায় প্রধান ভূমিকায় ছিলো ৯ম শ্রেণির পিতু ও সোহেল। তারা দীপ, পিয়াল ও হিরককে যুক্ত করেছে। বৃহস্পতিবার ছুটির পর পিয়াল, নিরবকে ওই ঘরে ডেকে নিয়ে যায়। নিহতের লাশ ময়না তদন্তের জন্য মর্গে প্রেরণ করা হয়েছে এবং আটক ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি চলছে। আসামিদের আদালতে স্বীকারোক্তি প্রদান ও মামলার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। নিহত নীরবের বাবার এবং এলাকাবাসীর দাবি অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে যাতে এ ধরনের ঘটনা আর পূর্ণবৃত্তি না হয়।





