
অনলাইন ডেস্ক
সকাল থেকেই উপজেলা শিল্পকলা অ্যাকাডেমির হলরুমজুড়ে ছিল শিশুদের প্রাণচাঞ্চল্য। কারও হাতে গানের খাতা, কেউ নৃত্যের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, আবার কেউ মঞ্চে ওঠার অপেক্ষায় বন্ধুদের সঙ্গে হাসি-আনন্দে মেতে উঠেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই অপেক্ষার অবসান। মঞ্চে শুরু হলো শিশু শিল্পীদের নৃত্য পরিবেশনা। একের পর এক নৃত্যের তালে তালে মুখর হয়ে উঠল পুরো হলরুম। শিশুদের হাসি, করতালি আর উচ্ছ্বাসে তৈরি হলো এক আনন্দঘন পরিবেশ। নেত্রকোনার দুর্গাপুরে শিশুদের সাংস্কৃতিক চর্চায় উৎসাহিত করতে এমনই ব্যতিক্রমী আয়োজন করেছে বসুন্ধরা শুভসংঘের উপজেলা শাখা।
শনিবার (২৮ আগস্ট) সকালে দুর্গাপুর উপজেলা শিল্পকলা অ্যাকাডেমির হলরুমে এ সাংস্কৃতিক পরিবেশনার আয়োজন করা হয়। এতে স্থানীয় শিশু শিল্পীরা গান, কবিতা, ছড়া, গল্প বলা ও নৃত্যসহ বিভিন্ন পরিবেশনায় অংশ নেয়। আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল শিশুদের দলীয় নৃত্য।
বর্তমান সময়ে শিশুদের অবসর সময়ের বড় একটি অংশ দখল করে নিয়েছে মোবাইল ফোন, অনলাইন গেম ও বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। প্রযুক্তির ব্যবহার যেমন শিশুদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে, তেমনি অতিরিক্ত নির্ভরতা তাদের স্বাভাবিক খেলাধুলা, সামাজিক যোগাযোগ ও সাংস্কৃতিক চর্চা থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। এমন বাস্তবতায় শিশুদের মেধা ও সৃজনশীলতার বিকাশে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রতি আগ্রহ তৈরি করার লক্ষ্যেই বসুন্ধরা শুভসংঘের এই আয়োজন।
অনুষ্ঠানে গান, কবিতা, ছড়া ও গল্প বলার মধ্য দিয়ে নিজেদের প্রতিভা তুলে ধরে শিশুরা। তবে মঞ্চে দলীয় নৃত্য শুরু হতেই যেন বদলে যায় পুরো পরিবেশ। ছন্দের সঙ্গে শিশুদের প্রাণবন্ত পরিবেশনা উপস্থিত দর্শকদের মুগ্ধ করে। একসঙ্গে কয়েকজন শিশুর নৃত্যে ফুটে ওঠে শৃঙ্খলা, সমন্বয় ও দলগত কাজের সৌন্দর্য। প্রতিটি পরিবেশনার পরপরই হলরুমজুড়ে বেজে ওঠে করতালি।
শুধু মঞ্চে পরিবেশনা নয়, পুরো আয়োজনজুড়েই ছিল শিশুদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। কেউ অন্যের পরিবেশনা দেখছিল মনোযোগ দিয়ে, কেউ আবার নিজের পালার অপেক্ষায় ছিল। অভিভাবকদের চোখেমুখেও ছিল আনন্দ ও গর্বের ছাপ। সন্তানকে মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিভা প্রকাশ করতে দেখে অনেক অভিভাবকই মুহূর্তগুলো ক্যামেরাবন্দি করেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দুর্গাপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি তোবারক হোসেন খোকন, বসুন্ধরা শুভসংঘের উপদেষ্টা এস এম রফিকুল ইসলাম রফিক, সাধারণ সম্পাদক আল নোমান শান্ত, যুবদল নেতা খোকন সরকার, সাংবাদিক আল আমিন হাওলাদার, স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ভোলা সরকারসহ শিশু শিল্পীদের অভিভাবকেরা।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে দুর্গাপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি তোবারক হোসেন খোকন বলেন, বর্তমানে মোবাইল ফোনের যুগে এসে আমাদের সাংস্কৃতিক চর্চা অনেকটা পিছিয়ে পড়ছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রতি আগ্রহ তৈরি করতে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। বসুন্ধরা শুভসংঘ যে ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করছে, তা প্রশংসনীয়। এ ধরনের উদ্যোগ নিয়মিত হলে শিশুদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের সুযোগ তৈরি হবে।
তিনি আরও বলেন, শিশুরা শুধু বইয়ের পড়াশোনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে তাদের পূর্ণাঙ্গ বিকাশ সম্ভব নয়। গান, নৃত্য, কবিতা, আবৃত্তি, খেলাধুলাসহ বিভিন্ন সৃজনশীল কর্মকাণ্ড শিশুদের আত্মবিশ্বাসী ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করে। তাই শিশুদের জন্য এমন আয়োজন আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
বসুন্ধরা শুভসংঘের সাধারণ সম্পাদক আল নোমান শান্ত বলেন, শিশুদের সাংস্কৃতিক চর্চায় উৎসাহিত করাই এ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য। পড়াশোনার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড শিশুদের মানসিক বিকাশ ও আত্মবিশ্বাস বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তিনি বলেন, আমরা চাই শিশুরা মোবাইল ফোননির্ভরতার বাইরে এসে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হোক। তাদের মধ্যে যে প্রতিভা রয়েছে, তা বিকাশের জন্য প্রয়োজন একটি সুন্দর পরিবেশ ও উৎসাহ। বসুন্ধরা শুভসংঘ সেই জায়গা থেকেই শিশু-কিশোরদের পাশে দাঁড়াতে চায়। ভবিষ্যতেও শিশু-কিশোরদের নিয়ে এ ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
আয়োজকদের মতে, একটি শিশুর বেড়ে ওঠা শুধু পরীক্ষার ফলাফল কিংবা শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার চিন্তা, কল্পনা, অনুভূতি ও সৃজনশীলতাকে বিকশিত করার জন্য প্রয়োজন সাংস্কৃতিক পরিবেশ। নৃত্য, গান, কবিতা কিংবা গল্প বলার মতো কর্মকাণ্ড শিশুদের নিজের কথা প্রকাশ করতে শেখায়। একই সঙ্গে মঞ্চভীতি কাটিয়ে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি করে।












