মৌলভীবাজারে বৈদেশিক মূদ্রা বিনিময়ে কারসাজি অবাধে চলছে ডলার পাউন্ড কেনা বেচা

মোহাম্মদ রায়হান,কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি:

প্রবাসী অধ্যূষিত মৌলভীবাজার শহরের বেরির পাড় পয়েন্টে রয়েল ম্যানসন মার্কেটের দ্বিতীয় তালায় সোনালী ব্যাংকের বৈদেশিক বাণিজ্য শাখার অবস্থান। এই মার্কেটের নিচ তলা ও আশপাশের এলাকায় গড়ে উঠেছে অবৈধ বৈদেশিক মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠান। বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের আড়ালে চলছে এসব অবৈধ ব্যবসা। এতে করে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।

সরেজমিনে শহরের বেরিরপাড় এলাকার রয়েল ম্যানশনে গিয়ে ছদ্ম বেশে প্রবাসী সেজে রয়েল ম্যানশনের ডানদিকের তৃতীয় দোকানে যান প্রতিবেদক। দেখে মনে হয়েছে মোবাইলের চার্জার ও বিভিন্ন ইলেকট্রনিক্স পণ্য বিক্রির দোকান এটি। দোকানের ক্যাশে বসা এক ব্যক্তিকে গিয়ে জিজ্ঞাসা করা হলো মানি এক্সচেঞ্জ করা যাবে কি না। উত্তরে বললেন যাবে।

তিনি বললেন ডলার নাকি পাউন্ড। দশ পাউন্ডের নোট বলায় তিনি বললেন ১২০ টাকা দেয়া যাবে। তারপর অনেক বাকবিতন্ডার পর পাউন্ড প্রতি ১৩০ টাকা দিতে রাজি হলেন। দশ পাউন্ডের নোট এক্সটেঞ্জ করা হলো ১৩শত টাকায়। এভাববেই প্রতিদিন সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকার বৈদেশিক মূদ্রা বিনিময় করছে এই সংঘবদ্ধ চক্র। প্রশাসনের নাকের ডগায় চলচে এসব মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠান।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, মৌলভীবাজার জেলায় একটি মাত্র বৈদেশিক মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সেটি হলো সৈয়দ মানি এক্সচেঞ্জ।
কিন্তু জেলায় রয়েছে অনন্ত শতাধিক অবৈধ মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠান। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে জমা দেয়া অবৈধ মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানের তালিকাসহ একটি নথি এসেছে।

তালিকায় অবৈধ মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠান হিসেবে রয়েছে শহরের রয়েল ম্যানশনের তরফদার এন্টারপ্রাইজ,শাহ মোস্তফা টেলিকম, জিশান এন্টারপ্রাইজ,রুমন এন্টার প্রাইজ, ফারিয়া ইলেট্রনিক্স,মদিনা ট্রেডার্স,আহমদ ম্যানশনের নিউ জলি ক্লথ স্টোর এর নাম। ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে এগুলো ছাড়াও অবৈধ আরো শতাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা প্রকাশ্যে এবং গোপনে বৈদেশিক মূদ্রা বিনিময় করে আসছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, এই চক্র বিদেশ থেকে আসা বৈদেশিক মূদ্রা কম দামে প্রবাসীদের কাছ থেকে কিনে। যখন দাম বেড়ে যায় তা আবার বেশি মূল্যে হুন্ডি ব্যবাসায়ীদের কাছ বিক্রি করে দেয়। এতে করে বৈদেশিক মূদ্রার বৃহৎ একটি অংশ কালো টাকা হিসেবে আড়ালে রয়ে যায়। এই চক্রের সাথে ঢাকার হুন্ডি ব্যবসায়ীদের যোগ সাজশ রয়েছে বলে জানা গেছে।

সরেজমিনে সাংবাদিকের উপস্থিতি টের পেয়ে দোকানের সাটার বন্ধ করে অনেকে সটকে পড়েন ব্যবসায়ীরা। রুমন এন্টার প্রাইজে গিয়ে জানতে চান এখানে মানি এক্সচেঞ্জ হয় কি না। ক্যাশে বসা ব্যক্তি বলেন, নানা আমরা এখানে কোন এক্সচেঞ্জ করি না। সৈয়দ মানি এক্সচেঞ্জে যান। একটি মাত্র প্রতিষ্ঠানেই এক্সচেঞ্জ হয়।

কিছু সময় অবস্থানের পর দেখা গেলো গাড়ি থেকে প্রবাসীরা নেমে আসছেন। অবৈধ এসব দোকানিরা তাদের রিসিভ করে মানি এক্সচেঞ্জ করছেন। মোবাইলের দোকান, টাইলসের দোকান, কাপড় ও প্রসাধনী সামগ্রীর দোকানসহ বিভিন্ন ব্যবসার আঁড়ালে চলছে অবৈধ হুন্ডি এবং মূদ্রা বিনিময় ব্যবসা। ক্রেতাকে হাতছাড়া না করতে একই ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান রাস্তার দুই পাশে গড়ে তুলেছেন একাধিক প্রতিষ্ঠান।

প্রবাসী অধ্যুষিত মৌলভীবাজার জেলায় প্রতিদিনই লন্ডন, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে মূদ্রা নিয়ে আসেন প্রবাসীরা। এসব বৈদেশিক মূদ্রা বিনিময় করতে এখানে এসে প্রতারণার শিকার হন তারা।

সরকার অনুমোদিত ব্যবসায়ী সৈয়দ মানি এক্সচেঞ্জ এর মালিক সৈয়দ ফয়ছল আহমদ বলেন, আমি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অনুমোদন নিয়ে সুনামের সাথে নির্দেশনা মোতাবেক ব্যবসা করছি। কিন্তু সোনালী ব্যাংকের নিচে ও আশাপাশ এলাকায় অবৈধভাবে ১৫-২০ বছর ধরে লাইসেন্স ও অনুমোদন ছাড়াই ব্যবসা করছে একটি চক্র। ওরা কিভাবে ব্যবসা করছে এটা প্রশাসনের দেখার বিষয়।

তিনি বলেন, অবৈধ মানি এক্সচেঞ্জ এর কারণে সরকার প্রচুর রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এখন আমরা যে পরিমাণ রাজস্ব দেই তার থেকে আরো বেশি রাজস্ব দিতে পারবো। সরকার উপকৃত হবে।

সোনালী ব্যাংকের বৈদেশিক বানিজ্য শাখার ব্যবস্থাপক মো. আজিজুল হক রাসেল বলেন, সরকার অনুমোদিত বৈদেশিক মানি এক্সচেঞ্জ হলো একটি প্রতিষ্ঠান সৈয়দ মানি এক্সচেঞ্জ, তারাই বৈধ ভাবে ব্যবসা করছে। আর অবৈধ ভাবে কেউ ব্যাবসা করছে কিনা আমার জানা নেই। অবৈধভাবে কিংবা সরকারের চ্যানেলের বাহিসে কেউ মানি লেনদেন করলে অবশ্যই সরকার রাজস্ব হারাবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে তো আসলে এসব অবৈধ চ্যানেল বন্ধ করা প্রয়োজন।


মৌলভীবাজারে বৈদেশিক মূদ্রা বিনিময়ে কারসাজি অবাধে চলছে ডলার পাউন্ড কেনা বেচা

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

0FansLike
3,912FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

Latest Articles