ছোট গল্প – মধুর ধ্বনি

লেখিকা:

ফারাহ্ শারমিন

আমার প্রথম মা হওয়ার অনুভূতি একদিকে যেমন ছিলো সুখকর, অন্যদিকে ছিলো আতংকে ভরা। শুধুই কারণে অকারণে কেঁদে ফেলতাম। সাবধানে মাটিতে পা ফেলতাম , টিপে টিপে হাটতাম। যেনো বাতাসের আঘাতেই আমি মাটিতে ধরাশায়ী হবো!

বাচ্চার বাবার অবস্থা ছিলো আরও হাস্যকর। এখন মাঝে মাঝে মনে পড়লে একা একাই হাসি।
আমার এই মেঘ এই বৃষ্টি অবস্থা দেখে বেচারা বুঝেই উঠতে পারছিলো আমি কি নিজেকে নিয়ে সুখী নাকি দুঃখী!!

একদিন বাসায় কেউ নেই, বিকেলে বারান্দায় বসে আছি। দেখছি একটি দেড় দু’বছরের ফুটফুটে মেয়ে বাবু বাবার হাত ধরে কোমর ঘুড়িয়ে ঘুড়িয়ে হাটছে।

আমার তখন মনে হলো এটা আমার জীবনে দেখা সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য।

জানি না কি হলো হাপুস নয়নে কাঁদতে বসলাম। আকাশের দিকে তাকিয়ে সৃষ্টিকর্তাকে মনে মনে বললাম, এটা আমার না কেনো??

সৃষ্টিকর্তা হয়তো মুচকি হেসেছিলেন তখন, কারণ তিনি তো জানেন আমার খেলাঘর পুতুল পুতুল সোনামণি, মিষ্টি মেয়ে “স্নেহা” এসে ভরিয়ে তুলবে।

সবার আশা, চোখের ভাষা প্রথম সন্তানটি হোক ছেলে। যার জন্য নীল রংয়ের কাপড় কিনতে হবে! বাড়ি থেকে সেলাই করা নকশী কাঁথা এলো, যার মাঝে লেখা একটা নাম ” রাজ”!

অর্থাৎ, বাচ্চার দাদি বার্তা পাঠালেন আমার কিন্তু পান কেনার লোক চাই!

আর এদিকে আমি তো দোকানে গেলেই পিংক কালারের ছোট ছোট জামাগুলোই হাতে তুলে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখি।

আমার আদরের প্রথম সন্তান, ফাইরুজ মোহায়রা স্নেহা আসলো আমার কোলে। শুরু হলো তাকে নিয়েই পুতুল পুতুল খেলা। কতো আদর আদর নাম ধরে ডাকি আর অমনি সে হাসি মুখে আমার দিকে তাকায়। যেনো সব কটা নামই ওর। ওকে যে নামে বেশি ডেকেছি তা হলো “গুলটুসির মা”।

তারপর সাড়ে চার বছর পর এলেন যিনি তিনি আর কেউ না সাফওয়ান ওরফে আমার ডাবলুস! যখনই পেটের ভিতর লাফালাফি করতো, ধাকাধাক্কি করতো আলতো করে পেটে হাত রেখে বলতাম –’ডাবলুস এগুলো করে না, আম্মু ব্যাথা পাই।’ আরও কতো কথা……!
আমার সুখের কথা, আমার অসুখের কথা, ভালো কথা, যনত্রণার কথা সব ওকে বলতাম। আমার মনে হতো সেও সব দুষ্টুমি একপাশে সরিয়ে রেখে আমার কথাগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতো।

আমি সারাদিন ওদের অনেক আজব আজব নামে ডাকি। এটা আমাদের একটা খেলা। ওরাও এমনভাবে জি বলে যেনো এটাই তাদের নাম।
তেমনই একটা নাম সাফওয়ান এর– বুলটুসির বাপ।

আমি বলি –এই বুলটুসির বাপ!

সাফা বলে– জি আম্মু!!

আজও আমি তাকে ডাকলাম এই বুলটুসির বাপ??!!

অমনি ওর জবাব – বলো বুলটুসি!!
আমি অবাক হয়ে ওর দিকে তাকালাম। সে দুষ্ট হাসি দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচালো….

যার মানে হলো আমরা এই গাছেরই ফল।


ছোট গল্প – মধুর ধ্বনি

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

0FansLike
3,912FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

Latest Articles