ওমানে নিহত প্রবাসীদের ক্ষতিপূরণের টাকা লুটে কোটিপতি লালমোহনের সবুজ

0
91

লালমোহন (ভোলা) প্রতিনিধি

মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম শ্রমবাজার ওমানে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের মৃত্যুর পর প্রদত্ত ক্ষতিপূরণের অর্থ প্রতারণার মাধ্যমে আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে ভোলার লালমোহন উপজেলার মোহাম্মদ সবুজের বিরুদ্ধে।

অভিযোগ রয়েছে, ওমান ও বাংলাদেশের একটি সংঘবদ্ধ চক্রের নেতৃত্ব দিয়ে তিনি ইতোমধ্যে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।জানা যায়, ওমানে বৈধভাবে কর্মরত কোনো বাংলাদেশি শ্রমিক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেলে দেশটির আইন অনুযায়ী নিহতের বৈধ ওয়ারিশরা এককালীন প্রায় ১৫ হাজার ওমানি রিয়াল (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় অর্ধকোটি টাকা) ক্ষতিপূরণ পেয়ে থাকেন। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সবুজের নেতৃত্বাধীন একটি চক্র মৃত ব্যক্তির পাসপোর্ট, মেডিকেল সনদসহ গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র জালিয়াতির মাধ্যমে ক্ষতিপূরণের অর্থ আত্মসাৎ করে আসছে।

অভিযুক্ত মোহাম্মদ সবুজ লালমোহন উপজেলার রমাগঞ্জ ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের কর্তারহাট বাজার এলাকার আব্দুল মালেকের ছেলে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কৃষক পরিবারের সন্তান সবুজ ছোটবেলা থেকেই উশৃঙ্খল ছিলেন। পড়াশোনায় অনীহার কারণে ২০০৮ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে ধারদেনা করে তাকে ওমানে পাঠানো হয় । সেখানে তিনি এক আইনজীবীর গাড়িচালক হিসেবে কাজ শুরু করেন। এই সূত্র ধরেই তিনি ধীরে ধীরে প্রতারণার জগতে জড়িয়ে পড়েন।

আরও অভিযোগ রয়েছে, ওমানে কোনো বাংলাদেশি শ্রমিক দুর্ঘটনায় মারা গেলেই সবুজ নিজেকে মৃতের আত্মীয় পরিচয় দিয়ে ওয়ারিশদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। পরে ভুয়া পাওয়ার অব অ্যাটর্নি ও জাল কাগজপত্র তৈরি করে আইনজীবীদের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণের অর্থ তুলে নিতেন। এভাবেই তিনি বিপুল সম্পদের মালিক বনে যান। লালমোহনে নিজ এলাকায় তিনি কোটি টাকা ব্যয়ে একটি রাজপ্রাসাদ নির্মাণ করেছেন বলে স্থানীয়রা জানান।

দেশে বসে তার এই প্রতারণা কার্যক্রমে সহযোগিতা করার অভিযোগ রয়েছে তার শ্বশুর মো. মাকসুদুর রহমানের বিরুদ্ধে। তিনি লালমোহন উপজেলার লর্ডহাডিঞ্জ ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের চাঁদপুর এলাকার বাসিন্দা।সবুজের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগে চট্টগ্রাম ও হবিগঞ্জে অন্তত তিনটি মামলা দায়ের হয়েছে। চট্টগ্রাম চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দায়ের করা একটি মামলার (সিআর-৩১৫২/২৪) বাদী মো. আরিফ জানান, ২০২১ সালের ১২ ডিসেম্বর ওমানের মাসিরা এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় তার বাবা নূরুল আবছার মারা যান। পরে ক্ষতিপূরণের জন্য আবেদন করলে ২০২৪ সালের ২৯ নভেম্বর জানতে পারেন, সবুজ ও ওমানের এক আইনজীবীর মাধ্যমে প্রায় ৪৮ লাখ ৫৮ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। এ ঘটনায় আদালত সবুজের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন।

একই ধরনের অভিযোগে চট্টগ্রাম চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে (সিআর-৪৭৯) আরেকটি মামলা করেন মো. খোরশেদ আলম। তার ছেলে ওমর ফারুক রনি ২০২৪ সালের ৪ মার্চ ওমানে দুর্ঘটনায় নিহত হন। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষতিপূরণের প্রায় ৩৬ লাখ টাকা জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়।

এ ছাড়া হবিগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে (সিআর-১৬৪) দায়ের করা মামলায় মো. স্বপন মিয়া অভিযোগ করেন, তার ভাই ফুল মিয়ার মৃত্যুর ক্ষতিপূরণের প্রায় ৪৮ লাখ টাকা ভুয়া আমমোক্তারনামা তৈরি করে আত্মসাৎ করেছে সবুজ ও তার সহযোগীরা।

সবুজের বাড়িতে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। তার স্ত্রী ইফফাত আরা তিন্নি বলেন, “আমার স্বামী এসব অভিযোগে ফাঁসানো হয়েছে। তিনি এখনো ওমানে আছেন।

অন্যদিকে সবুজের বাবা আব্দুল মালেক জানান, “আমি একজন সাধারণ কৃষক। ছেলের এমন কাজের কথা শুনে মর্মাহত।

সবুজের শ্বশুর মো. মাকসুদুর রহমান বলেন, আমাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, আমরা জামিনে আছি। আইনের মাধ্যমেই সবকিছুর নিষ্পত্তি হবে।

মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে সবুজ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমি এসব কাজে জড়িত নই। আদালত যদি আমাকে দোষী মনে করে, তাহলে সেই রায় মেনেই নেব।

লালমোহন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. অলিউল ইসলাম বলেন, সবুজ একজন বড় ধরনের প্রতারক বলে আমরা জানতে পেরেছি। বিদেশে নিহত বাংলাদেশি কর্মীদের ক্ষতিপূরণের অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। আমাদের থানায় একটি মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এসেছে। তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।


ওমানে নিহত প্রবাসীদের ক্ষতিপূরণের টাকা লুটে কোটিপতি লালমোহনের সবুজ

Share this news as a Photo Card

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here