সিলেটে লোডশেডিং রুটিন মানছে না পল্লী বিদুৎ

রাতারাতি বদলে যেতে থাকে পরিস্থিতি। শতভাগ বিদ্যুতায়নের কিছুদিন পরই লোডশেডিং। সাধারণ মানুষ থেকে ব্যবসায়ী, ছাত্র, শিক্ষক, সাংবাদিক সবারই প্রশ্ন ফের লোডশেডিং। বিদ্যুৎ যন্ত্রণা থেকে মুক্তির আনন্দে স্বস্তির নিঃশ্বাস থেকে ভোগান্তির নতুন পথ। কীভাবে দেখছেন পুরো পরিস্থিতি। দৈনিক একুশে নিউজ প্রশ্ন রেখেছিল নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে। বিষয়টি নিয়ে লিখেছেন-

মোঃ দেলোয়ার হোসাইন,গোয়াইনঘাট সিলেট প্রতিনিধি

হাসানুল বারী
প্রভাষক, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
রাত ৮টায় বিভিন্ন মার্কেটে পুলিশ হাজির। তারা বলছে, ৮টা বেজে যাচ্ছে, দোকান-পাট বন্ধ করে দাও। অথচ ঢাকা শহরে আমাদের ব্যবসা শুরুই হয় মাগরিবের পর। সরকার এমন একটা পর্যায়ে চলে এসেছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের বিড়ম্বনার শিকার হওয়ার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের ওপর সব থেকে বড় প্রভাব পড়েছে।
তারা না চাইলেও এমন সিদ্ধান্ত মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। বিদ্যুৎ ছাড়া তো কোনো ব্যবসাই চলবে না। মানুষ তো টাকা দিয়েই বিদ্যুৎ কিনছে। কোভিডের সময়ও তো অফিস বন্ধ ছিল, তখন ভবিষ্যতের এনার্জি সেভ করার সুযোগ ছিল, সেটা তো আর হয়নি। এখনকার ব্যবস্থা আরও অপ্রতুল। এর থেকে উত্তরণ পেতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই ব্যবস্থা নিতে হবে।

নাহিন বিন মাহমুদ
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
অনেক বছর ধরে লোডশেডিং হতো না। ফলে আমরা লোডশেডিং নামক বস্তুটাকে ভুলেই গিয়েছিলাম। আমরা যখন ছোটো ছিলাম তখন দেখতাম, রাতের বেলায় নিয়ম করে এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকতো না। আবার হঠাৎ দেখা যাচ্ছে, সাময়িক সময়ে লোডশেডিং নামক উপদ্রব দেখা দিয়েছে। ২-৩ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ থাকছে না, এটা খুবই বিরক্তিকর। সরকার বলছে, বিশ্বব্যাপী নাকি লোডশেডিং হচ্ছে। আসলে তো তা হচ্ছে না। বিভিন্ন দেশে আমার আত্মীয়রাও থাকেন। আমরা তাদের কাছে খোঁজ নিয়েছি, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রে তো কোনো ধরনের লোডশেডিং হচ্ছে না। অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে কুইকরেন্টাল করা হলেও আমরা এর ফল পাচ্ছি না। যে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো তৈরির কথা হচ্ছিল, সেটা এখনো হলো না। এগুলো অনেক আগেই চিন্তা করার দরকার ছিল।

জুবায়ের আহমেদ
রিপোর্টার, বাংলা ট্রিবিউন
লোডশেডিং আমাদের সবাইকে মানিয়ে নিতে হবে। যেহেতু বহির্বিশ্বে একটা চাপ পড়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে মুদ্রাস্ফীতি ঘটেছে। সরকারি অব্যবস্থাপনাও ছিল, এটাও সত্য। সব মিলিয়ে আমাদের সবাইকে সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করতে হবে যেন, এই সমস্যা থেকে দ্রুত উত্তরণ পেতে পারি। আমরা সকলেই ভুক্তভোগী। সরকারি নিয়ম-নীতি মেনে চললে দ্রুত এই সমস্যার সমাধান আসবে বলে আমার ধারণা।

আবু বক্কার সিদ্দিক
রিপোর্টার, আরটিভি
বাংলাদেশ এখন শতভাগ বিদ্যুতের দেশ। যদিও জ্বালানি সংকটের কারণে সম্প্রতি দেশের মানুষ লোডশেডিংয়ের মুখে পড়ছে। মঙ্গলবার ছিল সরকারের পরিকল্পিত লোডশেডিংয়ের প্রথম দিন। কিন্তু রুটিন অনুসারে রাত আটটা থেকে নয়টা পর্যন্ত লোডশেডিং হওয়ার কথা থাকলেও ভোর ছয়টা থেকে সকাল সাতটা, বেলা সোয়া ২টা থেকে সাড়ে ৩টা ও সন্ধ্যা পৌনে ৬টা থেকে রাত ৮টা তিনবার লোডশেডিং হয়েছে বিভিন্ন এলাকায়। ঢাকার চেয়ে ঢাকার বাইরেই লোডশেডিংয়ের রুটিন না মানার ঘটনা বেশি। তবে রাজধানীসহ শহরে এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং চালু হলেও ঢাকার বাইরে একাধিকবার লোডশেডিং এবং মাঠপর্যায়ে ৪-৫ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। আমার গ্রামের বাড়ি সাতক্ষীরায়। সেখানে এক ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের পর বিদ্যুৎ এলেও আবার আধা ঘণ্টা পর চলে যাচ্ছে। সরকার যদি সত্যিই বিদ্যুৎ সংকট দূর করতে চায়, তাহলে তাদের উচিত হবেÑ এ খাতের সকল অনিয়ম, দুর্নীতি, ভুল নীতি ও কৌশলের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া।

তানভীর আনজুম তুষার
সমাজকর্মী
জ্বালানি সাশ্রয়ে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং। জ্বালানি সংকটে বিদ্যুতের উৎপাদন কমিয়ে আনতে এই প্রক্রিয়া অবলম্বন করতে বাধ্য হয়েছে সরকার। সকল এলাকার বাসিন্দারা আগে থেকেই লোডশেডিংয়ের সময়সূচি সম্পর্কে জানতে পারবে। কল-কারখানার মালিকরা লোডশেডিংয়ের শিডিউল আগে থেকে জানতে পারলে বিদ্যুৎ বিভ্রাটজনিত ওয়েস্টেজ কম হবে। ফলে লোডশেডিংয়ের এই সিদ্ধান্তে ব্যবসায়ীদের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। লোডশেডিং প্রক্রিয়ার সুফল বয়ে আনতে দেশের সকল মানুষের আন্তরিক প্রচেষ্টা থাকা জরুরি। লোডশেডিং সাময়িক সমাধান হলেও দীর্ঘমেয়াদে সুফল আনবে না। বরং জ্বালানি খাতের সংস্কার, স্বচ্ছতা ও গ্যাস-কয়লার মতো নিজস্ব সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিতের প্রতি জোর দিতে হবে আমাদের।

ইভান মাহমুদ
উদ্যোক্তা
এই সরকারের আমলে বিদ্যুতের স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ায় লোডশেডিং কি ভুলতে বসেছিলাম। আজ বিশ্বে জ্বালানির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে দেশে বিদ্যুতের উৎপাদন কমে গেছে। যে কারণে লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে সমন্বয় করে চাহিদার জোগান দেয়া হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে এমন পদক্ষেপের মাধ্যমে সমন্বয় করে লোডশেডিং করার এমন সুন্দর প্রক্রিয়াও এদেশে প্রথম। বিশ্বে এই ক্রাইসিস যতদিন থাকবে সম্ভবত লোডশেডিংয়ের সমস্যা ততদিন থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। সরকার এরই মধ্যে এ সংকট সমাধানে পদক্ষেপ নিয়েছে। আশা করছি, এই সংকট আমরা কাটিয়ে উঠতে পারবো। সংকট থাকাকালে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের পাশাপাশি আমাদেরও বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে হবে।

মো. আল মামুন
পোশাক ব্যবসায়ী
আমার দৈনিক দোকান ভাড়া ৫০০ টাকা। দোকানের কর্মচারী আছে দু’জন। তাদের দু’জনের খাওয়া বাবদ ৩০০ টাকা আর আমার জন্য ২০০ টাকা রাখলে ৬০০ টাকা হয়। বিদ্যুৎ ও অনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে দৈনিক আমার ১ হাজার টাকা খরচ হয়। আমার ১ হাজার টাকা খরচ হলে দৈনিক বিক্রি করতে হয় ১৫ হাজার টাকা। সকাল ১০টায় শুরু করি, রাত ১০টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখলে আমাদের কোনো রকমে চলে। মানুষ অফিস থেকে বের হয়ে আমাদের কাছে আসে, বলে ভাই প্যান্ট-শার্ট দেখান। ওই সময়েই দোকান বন্ধ রাখতে হচ্ছে। সরকার যদি আমাদের দোকান ৯টা পর্যন্ত খোলা রাখার ব্যবস্থা করতো, তারা বলতো ২ মাস পরে আপনারা ৮টা পর্যন্ত খোলা রাখবেন। তা না করে তারা একবারে রাত ৮টায় বন্ধ করতে বললো।

জামিল আক্তার হোসেন
রড বিক্রেতা
গরমে এই কষ্ট সহ্য করে নিতে হবে। আমাদের করার কিছু নেই। দেশের পরিস্থিতিও ভালো না। ইউক্রেন ও রাশিয়ার যে যুদ্ধ, এর সঙ্গে আবার আমেরিকাও যুক্ত হয়েছে। যার পরিপেক্ষিতে বাংলাদেশের অবস্থা খুব একটা সুখকর নয়। সরকার যদি এই লোডশেডিং নিয়ে আরও ৩ মাস অগ্রসর হতে পারে তাহলে হয়তো একটা সমস্যার সমাধান হতে পারে। এই লোডশেডিংয়ে আমাদের ব্যবসা বাণিজ্যের সবক্ষেত্রেই কষ্ট হচ্ছে। তারপরও আমাদের এই কষ্টকে মেনে নিতে হবে, করার কিছু নেই। দেখেন দোকানের বিদ্যুৎ নেই, আমি পাখা নিয়ে বসে আছি। শ্রীলঙ্কার যে অবস্থা হয়েছে, তেলের জন্য রাস্তায় নামতে হয়েছে। এখানে সপ্তাহে এক লিটার করে তেল নিতে হয়েছে। আমাদের যেন এমন পরিস্থিতি না হয়, এজন্য সরকার মনে হয় এভাবে সমাধান করছে।


সিলেটে লোডশেডিং রুটিন মানছে না পল্লী বিদুৎ

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

0FansLike
3,912FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

Latest Articles