
মেহেদী হাসান শিশির
মানব সভ্যতার আদিম এবং প্রাচীনতম সংগঠন হ্চ্ছে পরিবার। পরিবার হচ্ছে একটি সমাজ বা রাষ্ট্রের ক্ষুদ্রতম একক। এই ক্ষুদ্রতম এককের ওপরই নির্ভর করে একটি জাতির সভ্যতা। পরিবার হচ্ছে মানুষ তৈরির কারখানা। পরিবারেই মানবশিশুর জন্ম হয়, পরিবারেই বিকশিত হয় এবং ধাপে ধাপে পূর্ণাঙ্গ মানুষে পরিণত হয়। পরিবারেই ভালো মানুষের জন্ম হয়, আবার খারাপ মানুষের জন্ম হয়। পরিবারেই রাষ্ট্রনায়কদের জন্ম হয়, আবার সভ্যতা ধ্বংসকারী নরপিশাচেরও জন্ম হয়। পরিবার নামক এই সংগঠনটি মানব সভ্যতার শুরুতে ছিল এবং শেষ পর্যন্ত থাকবে ,তবে তার আঙ্গীক বা কাঠামোর পরিবর্তন হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে হবে। ভালো-মন্দের পার্থক্য, গড়ে দেয়া, ধৈর্য, সহিষ্ণুতা, শালীনতা, বিনয়ই শেখানোর অন্যতম পাঠশালাই হচ্ছে পারিবার।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে দাড়িয়ে বলতে গেলে পরিবারের সাথে সম্পৃক্ত অর্থাৎ সন্তানদের মধ্যে এক অন্যরকম ঈষদচ্ছ সম্পর্কই নানা বিচ্ছিন্নতার কারণ। যা আধুনিক বর্তমান সময়টার জন্য এক ভয়াবহ বাজে রুপ। যার প্রভাবে ক্রমশই বেড়ে যাচ্ছে অপ্রীতিকর ঘটনা, বেড়ে যাচ্ছে পারিবারিক সম্পর্কের বিচ্ছেদ, বেড়ে যাচ্ছে মাদকাসক্তি, বেড়ে যাচ্ছে আত্নহত্যার মতো ভয়ংকর ব্যাধি।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট এই সমীক্ষা অনুযায়ী দেখা যায়, ১৮ বছর বা এর ঊর্ধ্বের বয়সী মানুষের মধ্যে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ মাদকাসক্ত। অন্যদিকে, ৭ বছর থেকে ১৮ বছর বয়সী মানুষের মধ্যে এই হার শূন্য দশমিক ১০ শতাংশ। আবার চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত দেশের দেড় শত জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকা এবং অনলাইন পোর্টাল থেকে আত্মহত্যার সংবাদ বিশ্লেষণের সমীক্ষা অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন অবধি ৫৩২ জন আত্মহত্যা করে, যার ৬৪ শতাংশই বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত ছিল। এর মধ্যেও বিশেষ একটি পরিসংখ্যান হলো পরিবারের সঙ্গে চাওয়া-পাওয়ার অমিল হওয়ায় ৭.৪২ শতাংশ আত্মাহত্যা করেছে। অর্থাৎ পরিবারের সাথে দূরত্বই নতুন এই সংকটের কারণ। আসছে আগামী নতুন বিশ্বের জন্য এক এই সমস্যাটি হুমকিস্বরুপ হয়ে দাড়াবে। সন্তানের বুঝার ক্ষমতা আর বাবা-মার বুদ্ধিমত্তা এক নয়। বাবা মা বয়সে বড়। তাদের নিউরনভর্তি অভিজ্ঞতা। জীবনের নানা বাঁকে বিভিন্ন পরিস্থির ফলাফল দেখে আসা, পোড় খাওয়া মানুষ। সন্তানের ব্যাপারে তারা প্রতিটা সিদ্ধান্তই অতীতের বাস্তব ঘটনাগুলোর ফ্রেমে ফেলে একটা যৌক্তিক সিদ্ধান্তে আসে। এই সিদ্ধান্ত ভুল হবার সম্ভাবনা কম। তবে নির্ভুল হবে তা বলছি না।
যৌক্তিক সিদ্ধান্ত সন্তানকে কখনোই বিপদে ফেলে না। যুক্তি যেহেতু শেষকথা নয়, তাই সিস্টেম-লসের মত দুয়েকটা সিদ্ধান্ত ভুল হয়েও যায়। আর সেই জায়গায়টিতেই সন্তান দিক হারিয়ে ফেলে, তখনই ঘটে যায় অপ্রীতিকর ঘটনা। সন্তান আর বাবা-মা এর মধ্যে একটা দূরত্ব তৈরী হয়। যার প্রভাবে পরিবারে একধরণের অস্থিতিশীল অবস্থা বিরাজমান হয়। ঠিক এই সময়টাতে বাবা-মা অর্থাৎ পরিবারের পরিজনদের উচিত সেই সন্তানের সাথে আপোস করে তাকে সঠিকভাবে বুঝানো। সেখানে হয়তো সন্তান সেই বুঝানোর ঘাটতির কারণেই তৈরি হয়ে যায় এক আপসহীন দূরত্ব, যার ফলে একটা সময় অল্পবয়সী ছেলেমেয়েরা হিতাহিতজ্ঞান ভুলে নিজেদেরকেই ধংসের পথে ধাবিত করে। অকালে ঝরে পড়ে তারা। এর জন্য জরুরি পারিবারিক বুঝাপড়ার অর্থাৎ বাবা-মায়ের সাথে সন্তানের সম্পর্ক হওয়া উচিৎ বন্ধুত্বপূর্ণ। কারণ প্রতিটি মানুষ তার বন্ধুর সাথে প্রায় সব কথা শেয়ার করে, এজন্য বাবা-মা কে সন্তানের সাথে এমনভাবে মিশতে হবে যেন সন্তান বাবা-মা কে বন্ধু ভাবতে পারে। সন্তানকে যথেষ্ট সময় দিতে হবে বাবা-মাকে, তাতে করে উভয়ের সম্পর্কের দৃঢ়তা বাড়বে,তৈরি হবে বন্ধুত্বপূর্ন সম্পর্ক। বাবা-মায়ের কাছ থেকে বিশ্বাস পেলে সন্তানদের মধ্যেও আত্মবিশ্বাস বাড়বে। এছাড়া বাবা-মায়ের কাছ থেকে স্বাধীনতা পাওয়াটাও খুব প্রয়োজনীয়, তবে সেক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। সেই সীমাবদ্ধতাটুকু বজায় রেখেই পারিবারিক বন্ধনগুলো হওয়া উচিত সৌহার্দ্যপূর্ণ।
মেহেদী হাসান শিশির
শিক্ষার্থী,সমাজবিজ্ঞান বিভাগ (৩য় বর্ষ)
আনন্দ মোহন কলেজ, ময়মনসিংহ।





