বাংলাদেশের পরিস্থিতি শ্রীলংকার মতো হবে না

অনলাইন ডেস্ক:

জটিল এক অর্থনৈতিক সংকটে ক্রমে তলিয়ে যাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা। জ্বালানি তেলের সংকট। রান্নার গ্যাসের অভাব। ভয়ংকর খাদ্য সংকটও দেখা দিয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে।

দিনের বেশির ভাগ সময় থাকছে না বিদ্যুৎ। কাগজের অভাবে বন্ধ রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা ও সংবাদপত্র প্রকাশনা। অভাব দেখা দিয়েছে কেরোসিন কিংবা পেট্রলের বাজারেও। পণ্য আমদানি ব্যয় নির্বাহের প্রয়োজনীয় অর্থ নেই দেশটির কোষাগারে। বিদেশি ঋণের ভারে জর্জরিত দেশটি পারছে না ঋণের কিস্তিও শোধ করতে। বৈদেশিক মুদ্রার তীব্র সংকট বেসামাল করে তুলেছে দেশটির অর্থনীতিকে।

তীব্র সংকট আর আকাশছোঁয়া দ্রব্যমূল্য তৈরি করেছে গণ-অসন্তোষ। কলম্বোর রাস্তায় কারফিউ জারি করা হয়েছে। আর্থিক দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে ‘শ্রীলঙ্কা’। স্বাধীনতা-উত্তর ৭৪ বছরের ইতিহাসে এতটা দুরবস্থায় কখনো পড়েনি দেশটি। একসময়ের দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে অগ্রসর দেশ শ্রীলঙ্কার কেন এই মরণদশা? বাংলাদেশও কী শ্রীলঙ্কার মতো একই পরিস্থিতে পড়তে যাচ্ছে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সংকটের কারণগুলো বাংলাদেশের অবস্থান থেকে পর্যালোচনা করতে হবে।

প্রথমত : বিগত ১৫ বছরে শ্রীলঙ্কা বেশ কিছু ব্যয়বহুল ও উচ্চাভিলাষী প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যার বেশির ভাগই অপ্রয়োজনীয় এবং অর্থনৈতিকভাবে অলাভজনক হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। এ ছাড়া জনকল্যাণ বিবেচনায়ও খুব একটা কাজে আসেনি এসব প্রকল্প। উদাহরণস্বরূপ ‘শ্বেতহস্তী’ প্রকল্প হাম্বানটোটা সমুদ্রবন্দর ও বিমানবন্দরের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। ফলে এসব প্রকল্প বৈদশিক ঋণের বোঝা বাড়ানো ব্যতীত আর কিছুই বয়ে আনতে পারেনি দেশটির অর্থনীতির জন্য।

দ্বিতীয়ত : অপরিকল্পিত প্রকল্প গ্রহণ ও গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের প্রতি উদাসীনতা। যেমন—শ্রীলঙ্কায় প্রতিবছর বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে ৮ শতাংশ হারে। কিন্তু ২০১৪ সাল থেকে দেশটি কোনো নতুন বিদ্যুত্ কেন্দ্রের উদ্যোগ নেয়নি। বিদ্যুত্ সংকটটি এখন ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে পড়েছে। অপরিকল্পিত মেগাপ্রজেক্ট শ্রীলঙ্কার উন্নয়নের প্রতীক না হয়ে গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তৃতীয়ত : বর্তমানে শ্রীলঙ্কার ঋণের হার জিডিপির ১১৯ শতাংশ। বিগত দেড় দশকে ধীরে ধীরে ঋণের ভারে জর্জরিত হয়েছে দেশটি। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন উত্স থেকে ঋণ নিলেও দেশটির ঋণের অন্যতম উত্স হচ্ছে সভরেইন বন্ড। বর্তমানে সভরেইন বন্ড বাবদ শ্রীলঙ্কার ঋণ রয়েছে সাড়ে ১২ বিলিয়ন ডলার। এসব বন্ডের ম্যাচিউরিটি ২০২২ সাল থেকে শুরু হলেও সুদাসলে এখন ওই বন্ডের অর্থ ফেরত দেওয়ার সামর্থ্য দেশটির নেই। অতএব পাকিস্তানের মতো ঋণ পরিশোধে অপারগতা ঘোষণা দিয়ে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের কাছে ‘বেইলআউট প্যাকেজের’ জন্য হাত পাতা ছাড়া চলমান সংকট থেকে উদ্ধারের কোনো পথ খোলা নেই শ্রীলঙ্কার।

চতুর্থত : ২০১৯ সালে প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষে জনপ্রিয় পদক্ষেপ হিসেবে ভ্যাট ও ট্যাক্স কমানোর সিদ্ধান্ত নেন। মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট)-এর হার ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৮ শতাংশ ধার্য করেন। এ ছাড়া ২ শতাংশ হারের ‘নেশন উন্নয়ন কর’ এবং ‘পে অ্যাজ ইউ আর্ন’ ব্যবস্থা বিলুপ্ত করেন। ফলে সরকারের রাজস্ব আয় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়, যা শ্রীলঙ্কাকে অধিক বৈদশিক ঋণ নিতে বাধ্য করে।

পঞ্চমত : শ্রীলঙ্কায় বৈদেশিক মুদ্রার বড় উৎস হলো ‘পর্যটন’। জিডিপিতে এ খাতের অবদান প্রায় ১০ শতাংশ। দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার আরেক বড় উৎস হলো ‘রেমিট্যান্স’। মহামারির আগে পর্যটন এবং রেমিট্যান্স থেকে শ্রীলঙ্কা প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার আয় করত। মহামারির কারণে পর্যটন খাতে যেমন নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, তেমনি রেমিট্যান্সের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে যায়।

ষষ্ঠত : কৃষি খাতে রাতারাতি ‘অর্গানিক ফার্মিং’ চালুর হঠকারী সিদ্ধান্ত আজকের এ পরিস্থিতির জন্য বহুলাংশে দায়ী। কৃষিবিদ ও বিজ্ঞানীদের সঙ্গে পরামর্শ না করেই এ সিদ্ধান্ত নেন প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষে। বৈদেশিক মুদ্রার মজুদের চাপ কমাতে রাসায়নিক সার আমদানি নিষিদ্ধ করেন, নিষিদ্ধ হয় কৃষিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার। ফলে শ্রীলঙ্কায় খাদ্যদ্রব্য উত্পাদন প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমে যায়। বেড়ে যায় খাদ্যদ্রব্যের দাম। এ ছাড়া বর্ধিত চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যে খাদ্য আমদানি করতে গিয়ে দেশটিকে আগের তুলনায় আরো বেশি বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করতে হয়।

বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক তুলনা 
আলোচনার সুবিধার্থে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার অর্থনীতির তুলনামূলক অবস্থা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন। শ্রীলঙ্কার মোট ঋণ ৩৩ বিলিয়ন ডলার। যেহেতু দেশটির মোট জনসংখ্যা দুই কোটি ২০ লাখ, সে হিসাবে শ্রীলঙ্কার মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ এক হাজার ৬৫০ মার্কিন ডলার। অন্যদিকে বাংলাদেশের মোট ঋণ ৪৯.৪৫ বিলিয়ন ডলার। যেহেতু বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৯৩ লাখ, সে হিসাবে মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ ২৯২.১১ ডলার। বাংলাদেশের চেয়ে শ্রীলঙ্কার মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ প্রায় ছয় গুণ বেশি। করোনা মহামারিতে শ্রীলঙ্কার রেমিট্যান্স পৌঁছেছে তলানিতে। ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশটির রেমিট্যান্স ছিল ৮.৫ বিলিয়ন ডলার। ওই অর্থবছরে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স ছিল ২৪.৭৮ বিলিয়ন ডলার, যা শ্রীলঙ্কার চেয়ে প্রায় তিন গুণ বেশি।

রপ্তানি আয় কমে যাওয়াকে বিশেষজ্ঞরা এই সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বর্তমানে শ্রীলঙ্কার রপ্তানি আয় ৮.৫ বিলিয়ন ডলার, যেখানে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ৩৮.৭৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ বাংলাদেশের রপ্তানি আয় শ্রীলঙ্কার চেয়ে প্রায় পাঁচ গুণ বেশি। মার্চ ২০২২ পর্যন্ত শ্রীলঙ্কার রিজার্ভের পরিমাণ দুই বিলিয়ন ডলার, যেখানে বাংলাদেশের রিজার্ভের পরিমাণ ৪৪.৪০ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে বাংলাদেশের রিজার্ভের পরিমাণ শ্রীলঙ্কার চেয়ে ২২ গুণ বেশি। ‘অর্গানিক কৃষি’ চালুর কারণে শ্রীলঙ্কার কৃষিজ উত্পাদন কমেছে। কিন্তু বাংলাদেশ ক্রমেই খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হচ্ছে।

উদাহরণস্বরূপ দানাদার খাদ্য, মাছ, মাংস ও ডিম উৎপাদনে বাংলাদেশের স্বয়ংসম্পূর্ণতার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। এ ছাড়া চাল উত্পাদনেও এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ।

শ্রীলঙ্কা থেকে বাংলাদেশ কী শিক্ষা নিতে পারে?
শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক তুলনায় একটা বিষয় স্পষ্ট যে অর্থনৈতিক সক্ষমতার সব সূচকেই বাংলাদেশ এগিয়ে রয়েছে। অর্থনীতিবিদরা শ্রীলঙ্কার এ চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের যেসব কারণ উল্লেখ করেছেন তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকিগুলো খুবই কম।

বাংলাদেশের মেগাপ্রকল্পগুলো জনবান্ধব, যুগোপযোগী ও টেকসই, যা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। উদাহরণস্বরূপ আমরা পদ্মা সেতুর কথা উল্লেখ করতে পারি, যেটি দেশের জিডিপিতে ১.২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি আনবে। জনকল্যাণের পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার বিষয়টিও প্রকল্পগুলো গ্রহণের সময় বিবেচনা করা হয়েছে। প্রকল্পগুলো চালু হলে দেশের সার্বিক চিত্র বদলে যাবে। ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি সঞ্চার হবে, সৃষ্টি হবে নতুন কর্মসংস্থান। দেশব্যাপী শিল্পায়ন ত্বরান্বিত হবে, নিশ্চিত হবে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন। তবে ভবিষ্যতে কোনো অবকাঠামো প্রকল্প গ্রহণের আগে প্রকল্পটির প্রয়োজনীয়তা, জনকল্যাণ এবং অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে। এ ছাড়া প্রকল্পগুলো যেন যথাসময়ে বাস্তবায়ন হয় সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় বেড়ে যাবে প্রকল্পের সার্বিক ব্যয়। মেগাপ্রজেক্ট বাস্তবায়নের কারণে আগের তুলনায় বাংলাদেশের ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। তবে প্রকল্পগুলো চালু হলে তা থেকে অর্জিত অর্থ দিয়ে এসব ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা সম্ভব হবে।

বর্তমানে বাংলাদেশে বৈদশিক ঋণের হার জিডিপির ১৩ শতাংশ। আইএমএফের হিসাবে এই হার ৫৫ শতাংশের বেশি হলেই বিপদ। সুতরাং এই মুহূর্তে ঋণ পরিশোধের দায়ের দিক থেকে বাংলাদেশ নিরাপদ অবস্থানে রয়েছে। তবে শ্রীলঙ্কা থেকে বাংলাদেশ বেশ কিছু বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশ আর কম সুদে ঋণ পাবে না। বেশি সুদের ঋণ নিয়ে বাড়বে দায়। তাই এখন থেকেই ঋণের দায় নিয়ে সতর্ক হতে হবে। বাংলাদেশের জিডিপির পরিমাণ, রপ্তানি আয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, রেমিট্যান্সসহ অর্থনীতির অন্যান্য সূচক বিবেচনায় এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে আপতদৃষ্টিতে বাংলাদেশের পরিস্থিতি শ্রীলঙ্কার মতো হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।


বাংলাদেশের পরিস্থিতি শ্রীলংকার মতো হবে না

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

0FansLike
3,912FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

Latest Articles