
ভোলা জেলা প্রতিনিধি
ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার দেউলা ইউনিয়নের তালুকদার হাট বাজার এলাকায় ‘ভাই ভাই ট্রেডার্স’-এর স্বত্বাধিকারী লোকমান হোসেনকে সার ডিলার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। তিনি সংশ্লিষ্ট এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা কিংবা ভোটার নন—এমন অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও কৃষকেরা। একই সঙ্গে তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে একাধিক সার ডিলারশিপ থাকার অভিযোগও উঠেছে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণসংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা-২০২৫ যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) জেলার জ্যেষ্ঠ কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী বোরহানউদ্দিন উপজেলার দেউলা ইউনিয়নের তালুকদার হাট বাজার এলাকায় গেলে স্থানীয় বাসিন্দা ও সাধারণ কৃষকেরা এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁদের দাবি, সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দা না হয়েও লোকমান হোসেন কীভাবে ওই এলাকায় সার ডিলার হিসেবে নিয়োগ পেলেন, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা ও কৃষক জানান, দেউলা ইউনিয়নের তালুকদার হাট বাজার এলাকায় সার ডিলার হিসেবে লোকমান হোসেনকে নিয়োগ দেওয়া হলেও তিনি ওই এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা নন এবং সেখানকার ভোটারও নন। এ ছাড়া তাঁর পরিবারের অন্য সদস্যদের নামেও সার ডিলারশিপ রয়েছে বলেও তাঁরা অভিযোগ করেন এবং নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, সেবিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
দেউলা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ও কৃষক আব্দুর রব বলেন, “ভাই ভাই ট্রেডার্সের মালিক লোকমান হোসেন এই ইউনিয়নের বাসিন্দা নন। সার ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে স্থানীয় বাসিন্দাদের অগ্রাধিকার দেওয়ার বিধান থাকলে তা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি, প্রকৃত কৃষক ও যোগ্য আবেদনকারীরা বঞ্চিত হলে ভবিষ্যতে সার সরবরাহ, মূল্য ও বাজার ব্যবস্থাপনায় সমস্যা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
লিটন নামের আরেক কৃষক অভিযোগ করে বলেন, “লোকমান হোসেন ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে একাধিক সার ডিলারশিপ পরিচালিত হচ্ছে বলে আমরা জানি। বিষয়টি সরকারি নীতিমালা ও সুষ্ঠু সার বিতরণ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, অনৈতিক আর্থিক লেনদেন, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের প্রভাব এবং রাজনৈতিক পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে ডিলারশিপ বাগিয়ে নেন। এ-সংক্রান্ত একটি কল রেকর্ড গণমাধ্যমকর্মীদের হাতে দিয়েছি।
দেউলা ইউনিয়ন পরিষদের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য কামরুন্নেছা (বেনু) বলেন, “আমি এই ওয়ার্ডের জনপ্রতিনিধি। লোকমান হোসেনকে আমি চিনি না। তিনি আমার ওয়ার্ডের বাসিন্দাও নন। শুনেছি, তিনি ভাই ভাই ট্রেডার্সের নামে নতুন সার ডিলারশিপ পেয়েছেন। কীভাবে তিনি এই নিয়োগ পেলেন, সে প্রশ্ন আমারও রয়েছে। তার মতে, সার ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে আবেদনকারীর স্থায়ী ঠিকানা, ভোটার পরিচয়, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অবস্থান এবং অন্যান্য যোগ্যতার শর্ত পূরণের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। তাঁদের অভিযোগ, এসব বিষয়ে যথাযথ যাচাই-বাছাই হলে সে কোনভাবেই ডিলার নিয়োগ পেত না।
কোন প্রক্রিয়ায় লোকমান হোসেনকে নির্বাচিত করা হয়েছে,তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাই।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ভাই ভাই ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী লোকমান হোসেনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পর তিনি ফোনটি কেটে দেন। পরে একাধিকবার চেষ্টা করেও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বোরহানউদ্দিন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা গোবিন্দকুমার মণ্ডল বলেন, “এত কথা বলা যায়, বলেন। ভাই ভাই ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী লোকমান হোসেন সেখানকার ভোটার কিংবা বাসিন্দা নন—বিষয়টি আমি জানি এবং শুনেছি। তাই যাচাই-বাছাই কমিটির দায়িত্বে থাকা সদস্যদের আমি তখনই বলেছিলাম, তাঁর বিষয়টি যেন যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই করা হয়। তাঁরা সেটা করেননি। এখন আমি কী বলব?
এবিষয় জানতে সভাপতি জেলা সার বীজ মনিটরিং কমিটি ও ভোলা জেলা প্রশাসক ড.শামিম রহমানকে তার ব্যবহারিত সরকারি মুঠোফোনে বারবার কল দিল তিনি ফোনটা রিসিভ করেননি।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব সেলিম খান জানান, “ডিলার নিয়োগে কোনো রাজনৈতিক সুপারিশ বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ করেই ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। জেলা কমিটির তালিকার ১ নম্বর ক্রমিকের বাইরে কাউকেই ডিলারশিপ দেওয়া হয়নি।”
উল্লেখ্য, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং-সংক্রান্ত কার্যক্রমের আওতায় গত ৭ অক্টোবর কৃষি অর্থনীতিবিদ শাহনাজ আক্তারের স্বাক্ষরে একটি আদেশ জারি করা হয়। ওই আদেশে সারাদেশে ইউনিয়নভিত্তিক নতুন সার ডিলার নিয়োগের বিষয়ে তথ্য জানানো হয়।
এদিকে জেলার কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি ও স্থানীয় কৃষকের আশঙ্কা, সার ডিলার নিয়োগে যোগ্যতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না হলে ভবিষ্যতে কৃষকদের সারপ্রাপ্তি নিয়ে সংকট, কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি এবং বাজারে একচেটিয়া প্রভাব বিস্তারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তাঁদের দাবি, কৃষকদের স্বার্থ সুরক্ষা এবং সার বিতরণব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে অভিযোগগুলো আমলে নেয়া হোক।













