কুড়িগ্রামের উলিপুরে গণহত্যা দিবস পালন ২০২২

মোঃ রোকনুজ্জামান রোকন,কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধি:

কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলাধীন হাতিয়া ইউনিয়নে অদ্য ১৩ -১১-২০২২ নভেম্বর বর্বরোচিত ‘‘হাতিয়া গণহত্যা দিবস”পালিত হয়েছে। ১৯৭১ সালের এই দিনে পশ্চিম পাকিস্তানের-হানাদার বাহিনী তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস বাহিনীর সহযোগীতায় নিরীহ ৬’শ ৯৭ জন অসহায় গ্রামবাসিকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে। উলিপুর সদর থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার পূর্ব দিকে ব্রহ্মপূত্র নদ বেষ্ঠিত হাতিয়া ইউনিয়নের দাগারকুটি গ্রামের ঘুমন্ত এসব নিরীহ মানুষকে ধরে এনে পাকিস্তানী হায়নারা নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে। স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে জঘন্যতম নরকীয় এ হত্যাকান্ডের ইতিহাসে তেমন গুরুত্ব না পেলেও উলিপুরে মানুুষের কাছে স্মরণীয় হয়ে আছে আজও।নিহত শহীদদের স্বজনরা খুঁজে ফিরে পেতে চায় তাদের আপনজনকে। দাগারকুটি গ্রামটিকে ঘিরে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করে এলাকার মানুষজন প্রতি বছর শহীদদের স্মরণ করে আসছিল। কিন্তু করালগ্রাসী ব্রহ্মপূত্র নদ দাগারকুটি গ্রামটিই তার বুকে ধারন করে নিয়েছে বিলিন হয়ে গেছে স্মৃতিসৌধটি। বর্তমানে অনন্তপুর বাজারের পশ্চিম দিকে নতুন করে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করে দিবসটি প্রতি বছর পালন করা হচ্ছে। ধীরে ধীরে স্বাধীনতা যুদ্ধের এ নরকীয় হত্যাযজ্ঞ হয়তো মানুষের হৃদয় থেকে মুছে যাবে, কিন্তু শহীদের স্বজনরা তাদের আপনজনদের স্মরণ করবেন সারাজীবন নিরবে-নিভৃতে।ভুলতে পারবেনা স্বজন হারানোর শোক বেদনা কে।

১৯৭১ সালের সেই নরকীয় রক্তঝরা দিনটি ছিল ২৩ শে রমজান, শনিবার। গ্রামের বেশীর ভাগ মানুষ সেহরীর খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন, কেউ ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এমতাবস্থায় ফজরের নামাজের আযান মুয়াজ্জিন এর ধ্বনিত হচ্ছে মসজিদে মসজিদে। নামাজের প্রস্তুতি নিতে অজুও সেরে ফেলেছেন অনেক মুসল্লী। হঠাৎ পাকিস্তানী হায়নাদের মর্টার সেল আর বন্দুকের অবিরাম গুলি বর্ষণে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে দাগারকুটি গ্রামসহ আশপাশের গ্রামের মাঠ। লোকজন কিছু বুঝে উঠার আগেই পাকিস্তানী হায়নারা ও তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস বাহিনী মিলে নিরীহ গ্রামবাসিদের বাড়ী-ঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়। এর সাথে চলতে থাকে লুটপাঠ ও নির্যাতন। অসহায় মা বোনদের ইজ্জত লুন্ঠন। আকস্মিক এ পরিস্থিতিতে এলাকার নিরীহ মানুষজন পাগলের মতো ছোটাছুটি শুরু করেন নিজের জীবন বাঁচানোর তাগিদে। পশ্চিম পাকিস্তানী বাহিনীর ছোঁড়া বৃষ্টির মতো গুলি বর্ষণে মানুষজন জীবন বাঁচাতে পার্শ্ববর্তী ধান ক্ষেতসহ ঝোঁপ-জঙ্গলে শুয়ে জীবন বাঁচানোর ব্যর্থ চেষ্টা করেন। অনেকে ব্রহ্মপূত্র নদে ঝাঁপ দিয়ে জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু অসহায় বৃদ্ধ আর শিশুদের আত্মচিৎকারে এলাকার আকাশ-বাতাশ ক্রমেই ভারী হয়ে উঠে। এসব অসহায় গ্রামবাসীর জীবন বাঁচানোর চেষ্টা মুহুর্তেই শেষ হয়ে যায়। পাক-হানাদার বাহিনী, তাদের দোসর রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস বাহিনীর সহযোগীতায় আত্মগোপন করা মানুষগুলোকে ধরে নিয়ে এসে দাগারকুটিতে জড়ো করে হাত-পা বেঁধে নির্দয় ভাবে গুলি করে হত্যা করে। তাদের এ নরকীয় হত্যাযজ্ঞ থেকে সেদিন বৃদ্ধ থেকে শুরু করে মায়ের কোলে ঘুমিয়ে থাকা শিশুটিও রক্ষা পায়নি। দিনব্যাপী চলে পাক-হানাদার বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ ও অগ্নিসংযোগ। আগুনে পুড়ে ছাঁই হয়ে যায়, হাতিয়া ইউনিয়নের অনন্তপুর, দাগারকুটি, হাতিয়া বকসি, রামখানা ও নয়াদাড়া গ্রামের শত শত ঘর-বাড়ী। মুহূর্তেই গ্রামগুলো পরিণত হয় ধ্বংস স্তুপে। সেগুলো আজ শুধুই স্মৃতি।

বয়সের ভারে ন্যুয়ে পরা স্বামী হারানো কচভান বেওয়া (৯০) এর সাথে কথা হলে তিনি বলেন, বাবা ওরা মোর স্বামীকে গুলি করি মারি ফেলাইছে। স্বামীর কথা মনোত উঠলে মোর কিছু ভালো লাগে না। এসব কথার এক পর্যায়ে তিনি হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেন।

একই কথা জানালেন জুলাপ বিবি (৮৫)। তিনি আরো বলেন, মুই (আমি) শুধু স্বামীকে হারাং নাই। তিন দেবর, শ্বশুরকেও হারাইছোং। ওরা কাকো বাইচপার (কাউকে বাচতে) দেয় নাই।

হাতিয়া গণহত্যার ৫১ বছর কেটে গেলেও এসকল স্মৃতি তাদের মনকে বিচলিত করে তোলে। হাতিয়া গণহত্যার শিকার শহীদ পরিবারগুলোর দাবী হাতিয়া গণহত্যা দিবস জাতীয় পর্যায়ে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনসহ ক্ষতিগ্রস্থ শহীদ পরিবার গুলোকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও পূনর্বাসন করতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সু দৃষ্টি কামনা করছে ঐ ইউনিয়নের জনসাধারণ।


কুড়িগ্রামের উলিপুরে গণহত্যা দিবস পালন ২০২২

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

0FansLike
3,912FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

Latest Articles