পা দিয়ে লিখেই এইসএসসি জয়

0
91

জিয়া উর রহমান,সাভার (ঢাকা) প্রতিনিধি

দুই হাত নেই। দুই পায়ের একটি পা ছোট অন্যটি বড়। খুব কষ্ট করে সাভারে বেড়ে ওঠে সোনিয়া। হাত ছাড়া স্বাভাবিকভাবে চলাফেরাও করতে পারে না সে। দরিদ্র পরিবারে বাবাও বেকার। মা বাসাবাড়িতে কাজ করে কষ্ট করে যোগান পড়ার খরচ। তবে এসব প্রতিবন্ধকতা দমাতে পারে নি তাকে। পরিবারের উৎসাহে লেখাপড়া শুরু করে সে। লেখার কাজ করে পা দিয়েই। এবার পা দিয়ে লিখে সাভার কলেজ থেকে এইচএসসি পরিক্ষা দিয়ে জিপিএ ৪.৩৩ পেয়ে কৃতকার্য হয়েছে সোনিয়া বুধবার (০৮ ফেব্রুয়ারি) সারা দেশে এইচএসসি সমমান পরিক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। ফলাফল অনুযায়ী সাভার কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে জিপিএ ৪.৩৩ পেয়ে পাশ করে সোনিয়া আক্তার। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রায় ২৩ বছর আগে নোয়াখালী থেকে কর্মের তাগিদে সাভারে আসেন সোনিয়ার বাবা শাহাদাত হোসেন ও তার মা আকলিমা।

সাভারে ২০০২ সালে জন্মগ্রহণ করে সোনিয়া। তবে পরিতাপের বিষয় দুই হাত ছাড়াই আল্লাহ তাকে দুনিয়াতে পাঠান। এমন সন্তান পেয়ে হতাশ হয়ে পড়েন নিম্নবিত্ত পরিবারটি। কিন্তু দারিদ্র্যতা আর শারিরীক প্রতিবন্ধকতা তাকে দমিয়ে রাখতে পারে নি। বর্তমানে সাভারের ব্যাংক কলোনি এলাকার ফিরোজ মিয়ার বাড়িতে বাবা মায়ের সাথে ভাড়া থেকে লেখা পড়া করছে সোনিয়া।   বাবা শাহাদাত হোসেন বর্তমানে বেকার। মা বিভিন্ন বাসাবাড়িতে কাজ করে সংসার চালান। সোনিয়ার গ্রামের বাড়ি বরিশাল বন্দর থানার রায়পুরা গ্রামে। ২৩ বছর যাবৎ ব্যংক কলোনীর হোসেন মাদবরের বাড়িতে ভাড়া থাকেন তারা। সোনিয়ার বয়স বর্তমানে ২০ বছর। ২০২০ সালে সাভারের অধরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় থেকে  জিপিএ ৩.২৮ পেয়ে এসএসসি পাশ করে সোনিয়া। এরপর সাভার কলেজে একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি হয় সে।

পরিবার জানায়, সোনিয়া জন্ম থেকেই হাত ছাড়া। একটি পা’ও  তার ছোট। আমরা পারিবারিকভাবে খুব ভেঙ্গে পড়ি। এমনি দু বেলা খাবার যোগাতে কষ্ট হয়। তবে মনবল হারাই নি। তার হাত না থাকলেও আমরা এই কষ্ট বুঝতে দেই নি। লেখাপড়ায় আগ্রহী করে তুলি। সোনিয়া নিজেও লেখাপড়া মন দিয়ে করে। অনেক কষ্ট করে পা দিয়ে লেখে সে। আর আমিও মানুষের বাসাবাড়িতে কাজ করে সোনিয়ার সব খরচ যোগানোর চেষ্টা করি। যদিও সোনিয়ার চাহিদা পূরণ করতে পারি না। তবে কষ্ট করে প্রতিবন্ধকতা ছাপিয়ে একের পর এক সফলতা পাচ্ছে সে। এখন সোনিয়াকে নিয়ে আমরা গর্বিত। আমরা তাকে কখনই বোঝা মনে করি না। সোনিয়ার বাবা শাহাদাত হোসেন বলেন, আমি আমার মেয়ের অবস্থা দেখে খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। কিন্তু তার অদম্য চেষ্টায় হাত ছাড়াই যে সফলতা ছুতে পারছে এতে আমার আর কষ্ট নেই। এখন সোনিয়া আমার গর্বের। আমরা যদি সামর্থবান হতাম তাহলে হাত ও পা লাগিয়ে মেয়েটার কষ্ট লাঘব করার চেষ্টা করতাম। কিন্তু দারিদ্র্যতার কষাঘাতে মেয়েটার কষ্ট লাঘব করা সম্ভব হচ্ছে না। কান্না জড়িত কন্ঠে তিনি বলেন, আমার মায়ের অন্তত হাত দুটার ব্যবস্থা হলে সে আরও ভাল করতো। এখন আমি বেকার। আমার কোন কাজ নেই। তবে আগে গার্মেন্টসে কাজ করতাম৷

সোনিয়ার মা আকলিমা আক্তার বলেন, আমি সোনিয়ার যাবতীয় কিছু পাশে থেকে সমাধান করার চেষ্টা করেছি। লেখা পড়া, খাওয়া-দাওয়াসহ সব কিছুতেই এমনভাবে সাপোর্ট দিয়েছি সে হাতের অভাব বোধ করে নি। কিন্তু মাঝে মধ্যে বলতো ‘মা’ আমার হাত দুটো যদি থাকতো তোমাকে জড়িয়ে ধরতে পারতাম। এমন কথা শুনেই চোখে পানি এসে যায়। কিন্তু সোনিয়াকে বুঝতে দেই নি। মাঝে মধ্যে বলে, হাত নেই তো কি হয়েছে, এই তো আমি পা দিয়েই হাতের কাজ চালিয়ে নিচ্ছি। এ ব্যাপারে সোনিয়া ঢাকাপোস্টকে বলেন, আমি ছোট বেলা থেকেই অনেক কিছু পা দিয়ে করার চেষ্টা করেছি। লেখাপড়া শুরু করলে পা দিয়ে লেখার চেষ্টা করে সফল হয়েছি। তখন থেকে পা দিয়েই লিখি। তবে চলাফেরা করতে আমার অনেক কষ্ট হয়। হাত না থাকলে স্বাভাবিক চলাফেরা করাও অনেক কষ্টদায়ক।

আজ যখন পা দিয়ে লিখে রেজাল্ট পেয়েছি তখনই সব কষ্ট ভুলে গেছি। তবে হাতের অভাব তো পূরণ হয় না। যদি ডিভাইসও আমার হাতের সাথে সংযুক্ত হতো তাহলে চলাফেরা করতে সুবিধা হতো। অন্তত যারা আমার জন্য এত কষ্ট করেছেন আমার বাবা-কে তো জড়িয়ে ধরতে পারতাম। এব্যাপারে সাভার কলেজের অধ্যক্ষ মো. ইমরুল হাসান ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমাদের সোনিয়া জিপিএ ৪.৩৩ পেয়েছে। এটা আমাদের কাছে বিশেষ কিছু। সোনিয়ার দুটি হাত নেই, এছাড়া তাঁর একটি পা বড় অন্যটি ছোট। এভাবেই কষ্ট করে সে কৃতকার্য হয়েছে। নানা প্রতিবন্ধকতা ছাপিয়ে আজ সে আমাদের গর্ব।


পা দিয়ে লিখেই এইসএসসি জয়

Share this news as a Photo Card

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here