
অনলাইন ডেস্ক
এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে বৈশ্বিক রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের জন্য যুক্তরাষ্ট্র যে কৌশলটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেছে, তা হলো বিদেশি সরকার পরিবর্তন বা রেজিম চেঞ্জ। গবেষণা বলছে, এই কৌশলের পরিণতি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হয়েছে ভয়াবহ।
জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ডাউন্স তাঁর ক্যাটাস্ট্রফিক সাকসেস হোয়াই ফরেন ইমপোজড রেজিম চেঞ্জ গোজ রং বইয়ে উল্লেখ করেছেন, ১৮১৬ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে বিশ্বে প্রায় ১২০ বার বিদেশি হস্তক্ষেপে সরকার পতন ঘটেছে। এর এক তৃতীয়াংশের জন্য দায়ী যুক্তরাষ্ট্র।
সবশেষ ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটকের ঘটনা এই তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রের ৩৬তম সংযোজন। সামরিক শক্তি ও আত্মবিশ্বাসের সমন্বয়ে ওয়াশিংটন একের পর এক দেশে হস্তক্ষেপ করলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ফলাফল হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা ও সহিংসতা।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বিদেশি শক্তির মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনকে ফরেন ইমপোজড রেজিম চেঞ্জ বা সংক্ষেপে ফার্ক বলে থাকেন। অধ্যাপক ডাউন্সের গবেষণা অনুযায়ী, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের প্রায় ২০টি দেশে যুক্তরাষ্ট্র বারবার হস্তক্ষেপ করেছে। ১৯৫৪ সালে গুয়াতেমালায় একের পর এক তিনটি সরকার ক্ষমতাচ্যুত করার ঘটনাও রয়েছে এই তালিকায়।
যুক্তরাষ্ট্রের রেজিম চেঞ্জ নীতির সবচেয়ে বড় ব্যর্থতার উদাহরণ হিসেবে ইরাক ও আফগানিস্তানের নাম উঠে আসে। ইরাকে সাদ্দাম হোসেনকে অপসারণের পর জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু সাদ্দামের পতনের তিন বছর পর ২০০৬ সালেও দেশটিতে চলছিল ভয়াবহ সহিংসতা। বাগদাদের রাস্তায় পড়ে থাকা শত শত বেওয়ারিশ লাশ সংগ্রহ করতে হয়েছিল মার্কিন সেনাদের।
এই নিহতদের অধিকাংশই ছিলেন তরুণ পুরুষ। কেউ হাত বাঁধা অবস্থায়, কেউ বিস্ময়ভরা চোখে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। তারা সবাই পড়েছিলেন এক সাম্প্রদায়িক গৃহযুদ্ধের কবলে, যার মাত্রা বুশ প্রশাসন আগেভাগে আঁচ করতে পারেনি। সুন্নি নিয়ন্ত্রিত সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনী ভেঙে দেওয়ার পর যে শূন্যতা তৈরি হয়, সেখানে ইরানপন্থী শিয়া মিলিশিয়া ও সুন্নি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
এই পরিস্থিতির ফলেই শুরু হয় শিয়া সুন্নি গৃহযুদ্ধ এবং পরবর্তীতে আইএসের উত্থান। সেই ক্ষত এখনো বয়ে বেড়াচ্ছে ইরাক, আর যুক্তরাষ্ট্রকে আজও ওই অঞ্চলে সেনা মোতায়েন রাখতে হচ্ছে।
অন্যদিকে, ২০ বছরের যুদ্ধ ও বিপুল অর্থ ব্যয়ের পর শেষ পর্যন্ত তালেবানের হাতেই আফগানিস্তানের ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয় যুক্তরাষ্ট্র।
ভেনেজুয়েলাও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক হস্তক্ষেপের ধারাবাহিকতার অংশ। অধ্যাপক ডাউন্সের মতে, অনেকেই মনে করেন এর চেয়ে খারাপ কিছু হতে পারে না। কিন্তু বাস্তবতা প্রায়ই ভিন্ন। তাঁর গবেষণায় দেখা যায়, বিশ্বজুড়ে সংঘটিত সরকার পরিবর্তনের এক তৃতীয়াংশের ক্ষেত্রে ১০ বছরের মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছে। ইরাক তার বড় উদাহরণ।
ভেনেজুয়েলায় মাদুরো ও তাঁর পূর্বসূরি হুগো শাভেজের সময়ে দুর্নীতি এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় অর্থনীতি আগে থেকেই ভেঙে পড়েছে। এর ফলে তৈরি হয়েছে লাখো শরণার্থী। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন বাস্তবতায় নতুন হস্তক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
অধ্যাপক ডাউন্স তাঁর গবেষণায় রেজিম চেঞ্জ ব্যর্থ হওয়ার দুটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন। প্রথমত, সরকার পতনের পর সংশ্লিষ্ট দেশের সামরিক কাঠামো ভেঙে পড়ে এবং হাজার হাজার সশস্ত্র সদস্য বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। দ্বিতীয়ত, বিদেশি শক্তির বসানো নতুন নেতৃত্ব জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা হারায় এবং পুতুল সরকারে পরিণত হয়।
ইতিহাস বলছে, রেজিম চেঞ্জ কেবল তখনই সফল হয়, যখন সংশ্লিষ্ট দেশে আগে থেকেই গণতান্ত্রিক অভিজ্ঞতা থাকে এবং সমাজ তুলনামূলকভাবে একজাতীয় হয়, যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী জাপান ও জার্মানি। কিন্তু ইরাক, লিবিয়া কিংবা ভেনেজুয়েলার মতো বিভক্ত সমাজে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ কখনোই ইতিবাচক ফল বয়ে আনেনি।
এনডিটিভি





