বাজিতপুরে সালিশের রায় না মানায় একঘরে ২০ সদস্যের পরিবার

0
31

কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে জমি সংক্রান্ত বিরোধে স্থানীয় সালিশের রায় না মানায় একটি পরিবারের ২০ সদস্যকে প্রায় ২০ দিন ধরে একঘরে করে রাখার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় কয়েকজন মাতাব্বরের বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কেউ সামাজিক যোগাযোগ করলে কিংবা তাদের আয়-রোজগারের কাজে সহযোগিতা করলে ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।

ঘটনাটি উপজেলার হিলচিয়া ইউনিয়নের ৭ নম্বর বেলভিডা দক্ষিণ সাতুঢা গ্রামের। ভুক্তভোগী পরিবারটি মৃত ভেলু মিয়ার দুই ছেলে মো. হবি মিয়া ও মো. রফিক মিয়ার পরিবার।

ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, তাদের প্রায় দেড় শতাংশ জমি নিয়ে প্রতিবেশী সেলিম ও শাহিনের সঙ্গে বিরোধ চলছে। সেলিম ও শাহিন দাবি করেন, ওই জমি তারা আগে কিছু টাকার বিনিময়ে কিনেছেন। তবে হবি ও রফিক মিয়ার পরিবারের দাবি, তারা ওই জমি বিক্রি করেননি এবং এ বাবদ কোনো টাকা গ্রহণও করেননি।

এ নিয়ে স্থানীয় কয়েকজন মাতাব্বরের উদ্যোগে একাধিকবার সালিশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সালিশে সেলিম ও শাহিন দাবি করেন, তারা ওই জমির জন্য পূর্বে টাকা দিয়েছেন। পরে সালিশকারীরা সিদ্ধান্ত দেন, সেলিম ও শাহিন হবি ও রফিক মিয়াকে দেড় লাখ টাকা দেবেন এবং বিনিময়ে তারা দেড় শতাংশ জমি ছেড়ে দেবেন। তবে ভুক্তভোগী পরিবার ওই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি।

পরিবারটির অভিযোগ, সালিশের সিদ্ধান্ত না মানায় অধু মিয়া, আবিরাজ মিয়া, কুদ্দুস, রিপন মিয়া (হিলচিয়া ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি), মন্নান ও রঙ্গু মিয়াসহ কয়েকজন মাতাব্বর তাদের একঘরে করার সিদ্ধান্ত নেন। পরে এলাকাবাসীকে ওই পরিবারের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ না করার জন্য নিষেধ করা হয়।

ভুক্তভোগী মো. হবি মিয়া অভিযোগ করে বলেন, গ্রামে তার একটি ধান ভাঙানোর রাইসমিল রয়েছে। সেখানে এলাকার কেউ ধান বা চাল ভাঙাতে গেলে তাকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এ কারণে মানুষজন তার রাইসমিলে ধান-চাল ভাঙাতে আসতে ভয় পাচ্ছেন। এতে তার ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

হবি মিয়া বলেন, “আমার রাইসমিলে এলাকার কেউ ধান-চাল ভাঙাতে আসলে তাকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে বলে বলা হয়েছে। এ কারণে মানুষজন আর আসতে চায় না। আমি খুব সমস্যার মধ্যে আছি।”

হবি মিয়ার ছোট ভাই মো. রফিক মিয়া পেশায় অটোরিকশাচালক। তিনি অভিযোগ করে বলেন, “আমি গরিব মানুষ। অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালাই। আমার অটোতে কেউ উঠলে তাকে ১০ হাজার টাকা এবং আমাকে কেউ অটোরিকশায় উঠালে তাকেও ১০ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে বলে জানানো হয়েছে। আমি পরিবার নিয়ে এখন কীভাবে চলব?”

এদিকে ভুক্তভোগী পরিবারের আরও অভিযোগ, সালিশকারীদের নির্দেশে তাদের স্তুপ করে রাখা গরুর খড় প্রতিবেশী দিলোয়ার হোসেন ভেঙে দিয়েছেন।

এ বিষয়ে দিলোয়ার হোসেন বলেন, “তিন বছর ধরে নিষেধ করতাছি, খড়ের স্তুপ সরায় না। এখন সালিশিয়ানরা ভেঙে ফেলতে বলছে, তাই ভেঙে দিয়েছি। কারণ এটা আমার জায়গা।”

তবে দিলোয়ার হোসেনের এ দাবির বিরোধিতা করে হবি মিয়া বলেন, “এটা রেকর্ডের রাস্তা। আমার বাড়ির ওপর দিয়ে রাস্তা যাওয়ায় আমি আমার জমির ওপর দিয়ে অন্যদিকে রাস্তা করে দিয়েছি। রেকর্ড অনুযায়ী জায়গাটি আমার।”

এ নিয়ে জমির মালিকানা ও রাস্তার জায়গা নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ রয়েছে বলে জানা গেছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সালিশকারীদের একজন এবং হিলচিয়া ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি রিপন মিয়া বলেন, “তাদের জমি সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে একাধিকবার বসেছি। কিন্তু তারা সালিশিয়ানদের রায় না মানায় তাদের একঘরে রাখা হয়েছে।”

ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, প্রায় ২০ দিন ধরে একঘরে থাকায় তারা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। একই সঙ্গে তাদের আয়-রোজগারের পথও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তারা প্রশাসনের কাছে ঘটনার তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া এবং একঘরে করে রাখার সিদ্ধান্ত থেকে মুক্তির দাবি জানিয়েছেন।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত সেলিম ও শাহিনের বাড়িতে গিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তাদের পাওয়া যায়নি। ফলে জমি বিক্রির দাবি ও সালিশের সিদ্ধান্তের বিষয়ে তাদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

ঘটনার বিষয়ে জানতে হিলচিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাজফারুল ইসলাম নাহিদের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমি ঘটনা সম্পর্কে অবগত না। তবে বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি দেখতেছি।”

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাজিতপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এস এম শহিদুল্লাহ মুঠোফোনে বলেন, “ঘটনা সম্পর্কে আমি অবগত না। তবে অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


বাজিতপুরে সালিশের রায় না মানায় একঘরে ২০ সদস্যের পরিবার

Share this news as a Photo Card

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here