
মোঃ সুমন বেপারী,শিক্ষানুবিশ প্রতিনিধি
বরগুনার তালতলী উপজেলার মঠখোলা থেকে চরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত সড়কটি যেন উন্নয়নের বাইরে পড়ে থাকা এক জনপদের প্রতিচ্ছবি। দীর্ঘদিন ধরে কাঁচা ও বেহাল অবস্থায় পড়ে থাকা এই সড়ক সামান্য বৃষ্টিতেই পরিণত হয় কাদা-পানির পথে। বছরের পর বছর এমন দুর্ভোগ চললেও স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে—কবে শেষ হবে স্থানীয় মানুষের এই ভোগান্তি?
স্থানীয়দের অভিযোগ, মঠখোলা থেকে চরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত সড়কটি এলাকার মানুষের অন্যতম প্রধান যোগাযোগের পথ হলেও এর উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগের অভাব রয়েছে। বর্ষা মৌসুমে সড়কের বিভিন্ন অংশে কাদা ও পানি জমে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যে, হেঁটে চলাচল করাও কঠিন হয়ে পড়ে। যানবাহন চলাচল তো অনেক ক্ষেত্রেই প্রায় অসম্ভব।
সড়কটির আশপাশে রয়েছে চরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, দাখিল মাদ্রাসা, মসজিদ, মন্দির ও ভোটকেন্দ্র। ফলে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ এই সড়ক ব্যবহার করেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতিদিন শতাধিক শিক্ষার্থী কাদা-পানি মাড়িয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করে। বর্ষাকালে সড়কের অবস্থা এতটাই খারাপ হয় যে অনেক শিক্ষার্থী সময়মতো বিদ্যালয়ে যেতে পারে না। দীর্ঘদিন ধরে এমন পরিস্থিতি চলতে থাকায় শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও নিয়মিত পড়াশোনার ওপরও এর প্রভাব পড়ছে বলে জানান অভিভাবকরা।
এলাকাটি কৃষিনির্ভর হওয়ায় সড়কের দুরবস্থার সরাসরি প্রভাব পড়ছে কৃষকদের ওপর। মাঠ থেকে উৎপাদিত কৃষিপণ্য স্থানীয় হাট-বাজারে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, ভালো সড়ক না থাকায় অনেক সময় পরিবহনকারীরা পণ্য নিতে অনীহা প্রকাশ করেন। বাধ্য হয়ে বেশি ভাড়া দিয়ে কৃষিপণ্য পরিবহন করতে হয়। এতে উৎপাদন খরচের সঙ্গে পরিবহন ব্যয়ও বাড়ে। শেষ পর্যন্ত বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম না পেলে কৃষকের লাভ কমে যায়।
সড়কটির বেহাল দশা শুধু দৈনন্দিন যোগাযোগের সমস্যা নয়; জরুরি স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও এটি বড় ঝুঁকি তৈরি করছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
গুরুতর অসুস্থ রোগী, বৃদ্ধ কিংবা গর্ভবতী নারীকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন হলে কাদা-পানিতে ভরা সড়ক বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। স্থানীয়দের দাবি, বর্ষাকালে অ্যাম্বুলেন্সসহ অনেক যানবাহন সড়কটির ভেতরে প্রবেশ করতে চায় না। ফলে রোগীকে মূল সড়ক পর্যন্ত নিয়ে যেতে অতিরিক্ত সময় ও শ্রম ব্যয় করতে হয়।
স্থানীয়দের প্রশ্ন—একটি সড়কের কারণে যদি জরুরি চিকিৎসা নিতে বিলম্ব হয়, তাহলে সেই সড়কের উন্নয়ন আর কতদিন অপেক্ষা করবে?
সড়কটির আশপাশে ভোটকেন্দ্রও রয়েছে। নির্বাচনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এই পথ দিয়ে সাধারণ মানুষকে যাতায়াত করতে হয়। অথচ গুরুত্বপূর্ণ একটি যোগাযোগপথ দীর্ঘদিন কাঁচা ও বেহাল অবস্থায় পড়ে থাকা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে।
তাদের প্রশ্ন, যে সড়কটি শিক্ষা, কৃষি, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা ও নির্বাচন—সব ক্ষেত্রেই মানুষের যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়, সেটি কেন দীর্ঘদিনেও স্থায়ীভাবে সংস্কার করা হচ্ছে না?
স্থানীয়দের দাবি, সড়কটি দ্রুত সংস্কার ও পাকাকরণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বারবার দাবি জানানো হলেও এখনো দৃশ্যমান স্থায়ী সমাধান হয়নি। তবে সড়কটি সংস্কারের জন্য অতীতে কোনো প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল কি না, বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল কি না কিংবা বরাদ্দ হয়ে থাকলে সেই অর্থের বাস্তবায়ন কতটুকু হয়েছে—এসব প্রশ্নেরও স্পষ্ট উত্তর চান এলাকাবাসী।
তাদের দাবি, শুধু সাময়িকভাবে মাটি বা ইট ফেলে সড়ক চলাচলের উপযোগী করার পরিবর্তে টেকসইভাবে পাকাকরণের উদ্যোগ নিতে হবে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, তারা কোনো বিশেষ সুবিধা চান না। একটি চলাচলযোগ্য, নিরাপদ ও টেকসই সড়কই তাদের প্রত্যাশা। শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত, কৃষকের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণ এবং জরুরি রোগী পরিবহনের কথা বিবেচনা করে দ্রুত সড়কটির উন্নয়ন করা প্রয়োজন।
এলাকাবাসীর প্রশ্ন, একটি সড়কের কারণে যদি একটি জনপদের শিক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্য ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে সেই সড়ক উন্নয়নের উদ্যোগ নিতে আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে?
তাই মঠখোলা থেকে চরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত সড়কটির বর্তমান অবস্থা সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে সড়কটি পাকাকরণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
তবে সড়কটির বর্তমান দুরবস্থা, সংস্কারের জন্য পূর্বে কোনো প্রকল্প বা বরাদ্দ হয়েছিল কি না এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা কী—এসব বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশল দপ্তর ও সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিদের বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটির অনুসন্ধানী দিক আরও স্পষ্ট হবে।













