
কুমিল্লা জেলা প্রতিনিধি
কুমিল্লা জেলাকে পুরোপুরি ‘কিশোর গ্যাং, মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত’ করতে জেলা পুলিশের শুরু করা অল-আউট ক্র্যাকডাউন বা সর্বাত্মক চিরুনি অভিযান এখন চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে। গত ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া মাত্র ১০ দিনের ৫ দফার বিশেষ মেগা অভিযানে জেলাজুড়ে এ পর্যন্ত রেকর্ডসংখ্যক ২ হাজার ৩৫ জন সন্দেহভাজন গ্যাং সদস্য ও অপরাধীকে আটক করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত শুক্রবার (২ অক্টোবর) রাতভর পরিচালিত পঞ্চম দফার অভিযানে মহানগরের মোস্ট ওয়ান্টেড ও আলোচিত কিশোর গ্যাং লিডার ইমরান হোসেন ওরফে রতনসহ (২৫) আরও ৩৬৩ জনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।
এক রাতের অভিযানে এত বড় সংখ্যার আটক এবং শীর্ষ গ্যাং লিডার গ্রেফতারের ঘটনা কুমিল্লায় অপরাধ দমনের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শুক্রবারের অভিযানের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল নগরীর ছোটরা এলাকার মফিজাবাদ কলোনির আবুল কাশেমের ছেলে ইমরান হোসেন রতনের গ্রেফতার। সে নগরীর ত্রাস হিসেবে পরিচিত কুখ্যাত ‘রতন গ্রুপ’ বা ‘আর স্কোয়াড’। রতনের বিরুদ্ধে ২০২২ সালে কুমিল্লা মিশনারি স্কুলের সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে সংঘটিত চাঞ্চল্যকর শাহাদাত হত্যাকাণ্ডসহ অস্ত্র, মাদক ও চাঁদাবাজির একাধিক মামলা রয়েছে।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে,ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনকে কাজে লাগিয়ে রতন অতি সম্প্রতি একটি বড় রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের ছায়াতলে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করছিল।এক ছাত্রনেতার সাথে তার অস্ত্র সরবরাহ ও রাজনৈতিক সমঝোতার ফোনালাপ ফাঁসের পর থেকেই জেলা পুলিশ তাকে ধরতে বিশেষ ফাঁদ পাতে।শুক্রবার গভীর রাতে ছোটরা এলাকার একটি গোপন আস্তানা ঘেরাও করে ডিবি ও থানা পুলিশের যৌথ দল তাকে বাগে আনে।
পুলিশের উচ্চপদস্থ সূত্রে জানা গেছে, গত ২৩ সেপ্টেম্বর যখন প্রথম দফার অভিযান শুরু হয়, তখন লক্ষ্য ছিল মূলত এলাকাভিত্তিক মাদক স্পট ও পাড়া-মহল্লার মোড়ে বখাটেদের আড্ডাগুলো উচ্ছেদ করা।প্রথম ৩ দফায় প্রায় দেড় হাজারেরও বেশি সন্দেহভাজনকে আটক করা হয়, যার বড় অংশই ছিল উঠতি বয়সী তরুণ।চতুর্থ দফায় এসে পুলিশ মূলত গ্যাংগুলোর ফাইন্যান্সার বা অর্থদাতাদের তালিকা তৈরি করে এবং তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এরই ধারাবাহিকতায় পঞ্চম দফায় এসে ১৮টি থানায় একযোগে ‘ব্লক রেইড’ দিয়ে সরাসরি গ্যাং লিডারদের নেটওয়ার্ক ধসিয়ে দেওয়া হয়।
কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও মিডিয়া মুখপাত্র মো. লুৎফর রহমান আজ সকালে প্রেস ব্রিফিংয়ে স্পষ্ট করেছেন যে, এই ২ হাজার ৩৫ জনের ঢালাও গ্রেফতার কোনো রাজনৈতিক বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিষয় নয়।তিনি জানান,আমরা সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে ব্লক রেইড দিয়েছি।আটককৃত ৩৬৩ জনসহ পূর্বের সবার ডিজিটাল ডিভাইস, মোবাইলের মেসেজ, সোশ্যাল মিডিয়া গ্রুপ এবং স্থানীয় অপরাধের রেকর্ড নিবিড়ভাবে যাচাই করা হচ্ছে।যাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই বা গ্যাং কালচারের প্রত্যক্ষ প্রমাণ মিলবে না, তাদের অভিভাবকদের ডেকে মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে।তবে রতনসহ সুনির্দিষ্ট অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং আজই তাদের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হচ্ছে।
টানা ১০ দিনের এই ঝোড়ো অভিযানের ফলে কুমিল্লার কান্দিরপাড়, চকবাজার, রেসকোর্স, হাউজিং এস্টেট ও টমছমব্রিজ এলাকার সাধারণ নাগরিকদের মাঝে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত আতঙ্ক কেটে স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে। এদিকে, রতনের মতো শীর্ষ নেতা গ্রেফতার হওয়ার পর শহরের অন্য কয়েকটি সক্রিয় গ্যাং যেমন ‘ঈগল গ্রুপ’, ‘ব্লেড ফাইটার্স’ এবং ‘ব্ল্যাক ড্রাগন’-এর লিডার ও তাদের রাজনৈতিক গডফাদাররা এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে চলে গেছে বলে গোয়েন্দা সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মোঃ আনিসুজ্জামান এই মেগা অভিযানের বিষয়ে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, কুমিল্লাকে আমরা সম্পূর্ণভাবে কিশোর গ্যাং ও সন্ত্রাসমুক্ত করতে দায়বদ্ধ।কোনো অপরাধীর পেছনে কার রাজনৈতিক বা সামাজিক ছত্রছায়া রয়েছে, তা দেখার সময় পুলিশের নেই।৫ দফায় ২ হাজার ৩৫ জন আটক হওয়াটা কেবল শুরু। যতক্ষণ না এই জেলার প্রতিটি নাগরিক বুক ফুলিয়ে নিরাপদে রাতে চলাচল করতে পারছেন, ততক্ষণ আমাদের এই চিরুনি অভিযান চলবে।












