
মোঃ মনিরুল ইসলাম খান,নিজস্ব প্রতিনিধি ময়মনসিংহ
২৮ আগস্ট ২০২৩ খ্রিঃ রোজ সোমবার বাদ আসর আঞ্জুমান ঈদগাহ মাঠে (ময়মনসিংহ) সাবেক ধর্মমন্ত্রী ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ মতিউর রহমানের প্রথম জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত জানাযায় প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের কয়েকজন মন্ত্রীসহ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। লাখ মানুষের উপস্থিতিতে আঞ্জুমান ঈদগাহ মাঠে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। এমনকি ঈদগাহ মাঠ ছাড়িয়ে রাস্তায়ও জানাযার নামাজ পড়েন মুসল্লিরা।
অধ্যক্ষ মতিউর রহমান স্যারের ছেলে মোহিত উর রহমান শান্ত কান্দা ভেজা চোখে সকলের কাছে বাবার জন্য দোয়া চেয়েছেন। তিনি বলেন, “আমার বাবা সারাটি জীবন মানুষের জন্য রাজনীতি করে গেছেন। তিনি কষ্ট ভোগ করেও সততার সাথে জীবন ধারণ করেছেন। কোন লোভ লালসা তাকে ছুঁতে পারেনি। তারপরও বাবা রাজনীতি করতে গিয়ে কাউকে কষ্ট দিয়ে থাকলে, অথবা আমরা তার সন্তান বা তার ভাইদের কারণে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে ক্ষমা করে দিবেন। বাবার কাছে কারও কোন দেনা পাওনা থাকলে আমার কাছে বলবেন আমি পরিশোধ করে দিবো।” বলে অঝোরে কাঁদলেন মোহিত উর রহমান শান্ত । কাঁদালেন লাখো নেতাকর্মী ও মুসল্লীদের। একজন সন্তানই জানে বাবা হারানোটা কতটা কষ্টের।
কবি বলেছেন, “এমন জীবন তুমি করিবে গঠন, মরিলে হাসিবে তুমি কাঁদিবে ভুবন।” কবির এই বানী যে সত্যি তারই প্রকাশ আজকের এই আঞ্জুমান ঈদগাহ মাঠ। লাখ মানুষের এই ভালবাসায় বলে দেয়, অধ্যক্ষ মতিউর রহমান কেমন মানুষ ছিলেন। লাখো মানুষকে কাঁদিয়ে তিনি চলে গেছেন না ফেরার দেশে।
ময়মনসিংহের মাটি ও মানুষের নেতা, আলমগীর মনসুর (মিন্টু) মেমোরিয়াল কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ কিংবদন্তী জননেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব অধ্যক্ষ মতিউর রহমান স্যার ২৭ আগস্ট ২০২৩ খ্রিঃ রোজ রবিবার রাতে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তার বয়স হয়েছিলো ৮১ বছর।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য আলহাজ্ব অধ্যক্ষ মতিউর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর ময়মনসিংহ শহরে মুক্তিবাহিনী প্রবেশ করে ময়মনসিংহকে মুক্ত ঘোষনা করে। তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সাবেক ধর্মমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
দীর্ঘ সময় তিনি ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৪-১৮ সালে টেকনোক্র্যাট কোটায় ধর্মমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে ১৯৮৬ ও ২০০৮ সালে তিনি ময়মনসিংহ-৪ (সদর) আসন থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
ছাত্র জীবন থেকেই অধ্যক্ষ মতিউর রহমান ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। পরে রাজনীতির পাশাপাশি আলমগীর মনসুর মেমোরিয়াল কলেজে (মিন্টু কলেজ) অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মিন্টু কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ ছিলেন তিনি। আলমগীর মনসুর মেমোরিয়াল কলেজের গর্ভনিং বডির বর্তমান সভাপতি ছিলেন তিনি। তার মৃত্যুতে মিন্টু কলেজ পরিবার গভীর শোক প্রকাশ করে। মিন্টু কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষ নীহার রঞ্জন রায় বলেন, “আবারো পিতৃহারা হলাম। উনার মৃত্যুতে কলেজের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। ঈশ্বর স্যারের আত্মার শান্তি দিন।”
মতিউর রহমান ১৯৪২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি শহরের পাশে আকুয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি স্ত্রী, এক ছেলে ও দুই মেয়ে রেখে গেছেন। ছেলে শান্ত ময়মনসিংহ মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক।
মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা সাবেক ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমান ময়মনসিংহ অঞ্চলের রাজনীতির এক প্রাণপুরুষ ছিলেন।
স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধকালিন কিশোরগঞ্জের সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ময়মনসিংহের রফিকউদ্দিন ভূঁইয়া এবং অধ্যক্ষ মতিউর রহমানের নাম ছিলো মানুষের মুখে মুখে। ইতিহাসে তারা থাকবেন স্বর্ণাক্ষরে।
মুক্তিযুদ্ধে ভারতের মেঘালয়ের তুরার ঢালুতে ইয়ুথ ক্যাম্পের নেতৃত্বে ছিলেন এই টগবগে ছাত্রনেতা। তিনি ১১ নম্বর সেক্টরে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেন। একাত্তরের ১০ ডিসেম্বর ময়মনসিংহ মুক্ত দিবসে ঐতিহাসিক মিছিলে নেতৃত্ব দেন কিংবদন্তি এই নেতা। শহরের সার্কিট হাউজ মাঠে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন তিনি।
১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন ময়মনসিংহের আলমগীর মনসুর মিন্টু। তার স্মরণে ওই বছর প্রতিষ্ঠা করা হয় আলমগীর মনসুর মিন্টু মেমোরিয়াল কলেজ। মতিউর রহমান জামালপুরের নান্দিনা কলেজের অধ্যাপনা ছেড়ে এই কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব নেন। পাঁচ বছর তিনি কলেজ থেকে কোনো ধরণে পারিশ্রমিক নেননি। উদ্দেশ্য ছিলো শহীদ মিন্টুর নামে কলেজটিকে প্রতিষ্ঠিত করা।
অধ্যক্ষ মতিউর রহমান ময়মনসিংহ পৌরসভার তিন বারের নির্বাচিত মেয়র।
বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী মতিউর রহমানকে নিয়ে একটি দৈনিকে লিখেছিলেন, তার গায়ের রং তেমন উজ্জ্বল না হলেও মুক্তিযুদ্ধে মতিউরের বুকের রং ছিলো সমুজ্জ্বল।
স্বাধীনতার পরই দায়িত্ব পান ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের। এরপর দুই বার সাধারণ সম্পাদক এবং পরবর্তীতে টানা ১৮ বছর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা।
২০০২ সালে ময়মনসিংহের চারটি সিনেমা হলে জঙ্গিরা বোমা হামলা করে। সেই ঘটনায় তাকে গ্রেফতার করে নিমর্ম নির্যাতন করা হয়।
২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে প্রথম প্রকাশ্যে গর্জে উঠেছিলেন এই পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদ। তিনি ফখরুদ্দিন-মঈন উদ্দিনকে ময়মনসিংহে অবাঞ্চিত ঘোষণা করেছিলেন।
শেখ হাসিনার মুক্তির ইস্যুতে ২০০৮ সালে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার ইনস্টিটিউটে আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় তিনি অনুষ্ঠানের প্রটোকল ভেঙে প্রথম দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, শেখ হাসিনার মুক্তি ছাড়া এদেশে কোনো নির্বাচন হবে না। একইসঙ্গে শেখ হাসিনার মুক্তির আন্দোলন ছাড়া এই সভায় কোনো আলোচনা হবে না। আঙুল তুলেছিলেন তখনকার সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিতি আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের দিকে। অধ্যক্ষ মতিউর রহমানের বক্তব্যের পরই ঘুরে যায় সভার পরিবেশ। শেখ হাসিনার মুক্তির গতি দ্রুত ত্বরান্বিত হতে থাকে ওই সভা থেকেই।
মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রাম থেকে শুরু করে জিয়াউর রহমান, এরশাদ, খালেদা জিয়া ও চারদলীয় জোট সরকারের আমলে বার বার গ্রেপ্তার হয়েছেন, জেল খেটেছেন বহু বছর। ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত দুই বার ২৩ মাস জেল খাটেন৷
দীর্ঘ সময়ে বুকের উত্তাপে আগলে রেখেছেন ময়মনসিংহের আওয়ামী লীগের রাজনীতি। ২০১৪ সালে দায়িত্ব পান ধর্ম মন্ত্রীর। তার মন্ত্রীত্ব লাভের মধ্যে দিয়ে ময়মনসিংহবাসী প্রথম পুর্ণ মন্ত্রীত্বের স্বাদ পেয়েছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহিদুল্লাহ হল ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি থেকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা হয়েছেন।
৮১ বছর বয়সে নিভে গেলো লড়াকু ও পোড় খাওয়া বর্ণিল রাজনীতিবিদ বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ মতিউর রহমানের জীবন প্রদীপ।











