
অনলাইন ডেস্ক
গ্যাস-বিদ্যুতের লিকেজ থেকে বিস্ফোরণ বা বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মরছে মানুষ। প্রতিনিয়ত কোথাও না কোথাও এমন ঘটনা ঘটে চলেছে। লম্বা হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। যেন মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে গ্যাস ও বিদ্যুতের লাইন। কিন্তু বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দীর্ঘদিনের পুরোনো, জরাজীর্ণ, ঝুঁকিপূর্ণ লাইন অপসারণ বা মেরামত হচ্ছে না পুরোপুরি। এসব লাইন থেকে চুরি করে গ্যাস ও বিদ্যুৎ ব্যবহার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে অনেকে। সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিতার অভাবেই অগ্নিকা- ও প্রাণঘাতির ঘটনা বন্ধ হচ্ছে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
শুক্রবার মিরপুরে জলাবদ্ধ পানিতে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা গেছে ৪ জন। এর আগে ওয়ারীতে মারা গেছে ১ জন। কয়েক বছর আগে গাজীপুরে ১টি কারখানায় জমা পানি বিদ্যুতায়িত হওয়ায় দুজন মারা যায়। এ ছাড়া রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে মৃত্যু। বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে তার ছিঁড়ে মৃত্যু। বাড়ির ছাদে কাপড় শুকাতে গিয়ে মৃত্যু। ঘরে পানি উঠেছে তাতে তার ছিঁড়ে মৃত্যু। সারা দেশে এমন মৃত্যুর ঘটনা অসংখ্য। জানা গেছে, মিরপুরে বিদ্যুতের খাম্বা থেকে চোরাই লাইন নিয়ে ব্যবহার করা হতো। বৃষ্টিতে সড়কে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলে সেই লাইন থেকে পানি বিদ্যুতায়িত হয়। সেই পানিতে নেমে ৪ জনের করুণ মৃত্যু হয়।
অপরদিকে গত ৭ মার্চ পুরান ঢাকার সিদ্দিক বাজারে গ্যাস লিকেজ থেকে সৃষ্ট বিস্ফোরণে ২৬ জনের প্রাণহানি ঘটে। ২০২১ সালে মগবাজারে বিস্ফোরণে ১২ জনের মৃত্যু, আর ২০২০ সালে নারায়ণগঞ্জের মসজিদে আগুনে ৩৪ জনে পুড়ে মরার ঘটনাও ঘটে একই কারণে। সর্বশেষ গত শনিবার নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে একটি বাসায় গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজ থেকে বিস্ফোরণের ঘটনায় ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।
কোনো দুর্ঘটনা ঘটলেই দেওয়া হয় নানা প্রতিশ্রুতি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রতিকার আর হয় না। পুরোনো লাইন মেরামত করা হয় না। আবার ঘটে দুর্ঘটনায় মৃত্যু। এভাবেই চলছে।
শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর ৭ লাখেরও বেশি মানুষ আগুনে পুড়ে হতাহত হন। আগুনে পোড়া রোগীর ৪০ শতাংশই গ্যাস বা বিদ্যুতে পোড়া। এদের বেশিরভাগই রান্নার গ্যাসের আগুনে। রান্নার গ্যাসে অগ্নিদগ্ধদের মধ্যে বছরে কমপক্ষে ৩ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। আর প্রাণে বেঁচে যাওয়াদের অধিকাংশই কর্মক্ষমতা হারান। বছরে প্রায় ৭০ হাজার মানুষ চিকিৎসা নেন দগ্ধ হয়ে। এর মধ্যে প্রায় ২০ হাজার মানুষ বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনার শিকার।
ফায়ার সার্ভিসের পরিসংখ্যানে বলা হচ্ছে, রাজধানীতে অগ্নিদুর্ঘটনার প্রায় ৩০ ভাগই গ্যাসের পাইপলাইনের ছিদ্র থেকে। গত এক বছরে ছোট-বড় প্রায় ১ হাজার অগ্নিকা-ের জন্য দায়ী গ্যাস।
সারা দেশে প্রায় ২৫ হাজার কিলোমিটার গ্যাস পাইপ লাইন আছে এখন। এর মধ্যে বিতরণ ও সার্ভিস লাইন প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার। ঢাকায় বাসাবাড়িতে তিতাসের গ্যাস সরবরাহ শুরু ১৯৬৭ সালের দিকে। তিতাসের পাইপলাইন আছে প্রায় সাড়ে ১২ হাজার কিলোমিটার। এর মধ্যে ঢাকায় জালের মতো ছেয়ে আছে ৭ হাজার কিলোমিটার পাইপ। যার ৭০ শতাংশ অতি ঝুঁকিপূর্ণ। সবচেয়ে বেশি গ্যাসের লাইন বসানো হয়েছে ৮০ ও ৯০-এর দশকে। সে হিসেবে তিতাসের পাইপগুলোর বয়স এরই মধ্যে ৩০ থেকে ৫৫ বছরের পুরোনো হয়ে গেছে। মেয়াদোত্তীর্ণ পাইপলাইন ব্যবহারের কারণে গ্যাসের সরবরাহ লাইনে, না হলে এর সংযোগস্থলে ছিদ্র হয়ে যাচ্ছে। যা থেকে গ্যাস বেরিয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করছে। আবার অবৈধ পাইপও ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলেছে। ২০১০ সাল থেকে গ্যাস সংযোগ বন্ধ। এই সময়ে লাখ লাখ অবৈধ সংযোগের খবর পাওয়া যায়। সাধারণ পানির পাইপে করে অনেক স্থানে অবৈধ গ্যাস নেওয়া দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় রাস্তা সংস্কারের কারণেও পাইপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে দুর্ঘটনা ঘটে।
এ ছাড়া গ্যাস বিপণন নিয়মাবলি-২০১৪ অনুযায়ী, আবাসিক খাতে মিটার ছাড়া গ্রাহকদের ক্ষেত্রে দুই বছরে একবার এবং মিটার ব্যবহারকারী গ্রাহকদের বাসায় বছরে একবার পরিদর্শনে যাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে তা না হওয়ায় দুর্ঘটনা বাড়ছে।
রাজধানীজুড়ে রয়েছে বিদ্যুতের তারের জঞ্জাল। খোলা ও লিকেজ তারের মাধ্যমেই অধিকাংশ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। এ ছাড়া অবৈধ লাইন ব্যবহারের ফলে বাড়ছে দুর্ঘটনা। পুড়ছে মার্কেট।
বিশেষ করে বস্তি ও ফুটপাথে বিদ্যুৎ সংযোগ সবই অপরিকল্পিত এবং অরক্ষিত। অভিযোগ আছে অবৈধ সংযোগের পেছনে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থার লোকজন জড়িত।
বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, গ্রাহকের ইন্টারনাল সার্ভিসের ওয়ারিং ত্রুটির কারণে বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। কোনো অবস্থাতেই খোলা বিদ্যুতের তার বা ভেজা তার বা ভেজা তারে লাগানো জিনিসপত্র স্পর্শ করা যাবে না। যেকোনো প্রয়োজনে বিদ্যুৎ সেবা পেতে ১৬৯৯৯-এ গ্রাহকরা ফোন করতে পারেন।
তিতাস বলছে, অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে, জরিমানা করা হচ্ছে। পুরোনো পাইপ প্রতিস্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে। হট লাইনে অভিযোগ পেলেই তিতাসের টিম ছুটে গিয়ে তা মেরামতে কাজ করছে। লিকেজ নির্ণয়ের জন্য গ্যাসের সঙ্গে গন্ধযুক্ত কেমিক্যাল মেশানো হচ্ছে। বেশিরভাগ দুর্ঘটনা ঘটছে অবৈধ সংযোগের কারণে।
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অবহেলা ও ভুলের কারণে একের পর এক দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু হলেও তাদের কোনো জবাবদিহিতা নেই। এসব দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন তিনি।
ডিপিডিসির নির্বাহী পরিচালক বিকাশ দেওয়ান বলেন, অবৈধ সংযোগ নেওয়া দ-নীয় অপরাধ। এ জন্যই বেশিরভাগ দুর্ঘটনা ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আমরা অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে প্রতিনিয়ত কাজ করছি। এ ছাড়া বিদ্যুতের লাইন মাটির নিচ দিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে। এটা হয়ে গেলে দুর্ঘটনা হ্রাস পাবে। অবৈধ সংযোগের সঙ্গে কেউ জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ রোববার এক অনুষ্ঠানে বলেন, তিতাসের পাইপলাইনগুলো অনেক পুরোনো হয়ে গেছে। ৫০-৬০ বছরের পুরোনো। অধিকাংশ পাইপলাইন লিক। অনেক চোরাই লাইন তৈরি হয়েছে। বিচ্ছিন্নভাবে বছরকে বছর ধরে এ কাজগুলো হয়ে আসছে। এগুলোর সমাধানে বড় প্রজেক্ট নিয়েছে তিতাস। সে প্রকল্প শেষ হতেও ৪-৫ বছর সময় লাগবে।













