
মোঃ আল ইমরান,স্টাফ রিপোটার নেত্রকোনা
নাম তার চুমকি আক্তার। জন্মের পর শিশুকালেই হারিয়েছেন মাকে। তারপর তার বাবা ২য় বিয়ে করলে সৎমায়ের কোলেই তার বেড়ে উঠা। চুমকি বড় হতে থাকলে লেখা পড়ার জন্য ধোবাউড়া উপজেলা সদরের একটি মাদরাসায় হেফজ বিভাগে তাকে ভর্তি করেদেন তার বাবা। সেখানে তিনি কয়েক পারা কোরআনও মুখস্থ করেন। তখন পর্যন্তই তিনি আর দশজন ছেলে মেয়ের সাথে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছিলেন। তার বয়স যখন ৯বছর তখন তাকে ভর্তি করানো হয় এ অঞ্চলের বড় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বালিয়া মাদরাসায়। সেখানে কিছুদিন যেতে না যেতেই ঘটে বিপত্তি। একদল তৃতীয় লিঙ্গের লোক পুলিশ সদস্য নিয়ে সেখানে গিয়ে উপস্থিত। তারা চায় চুমকি কে তাদের সাথে নিয়ে যেতে। কারন চুমকি তাদের সম্প্রদায়েরই লোক। তখন অনেক বাক বিতন্ডার পর এক পর্যায়ে যথযথ প্রমান উপস্থাপন করলে প্রমান হয় চুমকি আসলে তৃতীয় লিঙ্গের একজন মানুষ।
এই চুমকির বাড়ী নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়নের গিরিয়াসা গ্রামে। তার পিতার নাম মো: সুরুজ আলী, মাতা মোছা: পুলেছা বেগম। বর্তমানে ঘাগড়া ইউনিয়নের গিরিয়াসা আশ্রয় কেন্দ্রে তার বসবাস। উপজেলার একমাত্র তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার হিসেবে তার খোঁজখবর নিতে গেলে বেড়িয়ে আসে তার জীবনের অজানা তথ্য। একান্ত আলাপে চুমকি জানায়, বালিয়া মাদরসায় অধ্যয়নকালে তিনি প্রথম জানতে পারেন তিনি তৃতীয় লিঙ্গের একজন মানুষ। তখন তৃতীয় লিঙ্গের অন্যান্য উপস্থিত লোকজন তাকে ঢাকায় নিয়ে যায়। সেখান থেকে তাকে মাদ্রাজে পাঠিয়ে দেওয়া হয় তৃতীয় লিঙ্গের ভাষা, আচার আচরন, কলা কৌশল, নিয়ম কানুন রপ্ত করতে। সেখানে প্রশিক্ষণ শেষে তাকে আবার ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। ঢাকায় তাদের জনগোষ্ঠীর সর্দারিনীর ছায়ায় থেকে তাকে বিভিন্ন কাজ করতে হয়, রাস্তায় চাঁদা তোলা, নবজাতক শিশু জন্ম হলে তার পরিবারের কাছ থেকে বকশিশের নামের চাঁদা তোলে আনা ইত্যাদি। দিন শেষে সকল টাকা তোলে দিতে হত ওই সর্দারিনীর হাতে। কোন ব্যত্যয় হলে তাকে শারিরীক আঘাত সহ্য করতে হত। এসব কাজ করতে তার ভাল লাগতনা। বাড়ীর জন্য মন কাঁদতো। এরই মাঝে তার কেটে যায় আরও প্রায় ৪০ বছর। একদিন কাউকে না বলে সবার অজান্তে চলে আসেন নিজজন্মভুমি পূর্বধলার গিরিয়াসা গ্রামে। এরই মাঝে তার পিতাও মারা যান।
পরিবারের অন্য কারো কাছে যখন আশ্রয় পাচ্ছিলেন না তখন তৎকালীন ঘাগড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম মেঘশিমুল তার নিজ বাড়ীর পাশে ২শতক জমি দেন তাকে সেখানে থাকার জন্য। ঢাকা থেকে চলে আসায়ও ঘঠে বিপত্তি। সেখন থেকে একদল হিজড়া এসে অভিযোগ করেন চুমকি ঢাকা থেকে নগদ টাকা ও স্বর্নালংকার নিয়ে পালিয়ে এসেছেন। পরে স্থানীয় দরবারে অভিযোগ মিথ্যে প্রমানিত হলে তিনি স্থায়ীভাবেই নিজ এলাকায় থেকে যান। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর দেয়া উপহারের গিরিয়াসা আশ্রয়ন প্রকল্পের ঘরে তার বসবাস। এলাকার আসে পাশের লোকজনদের সাথে তিনি স্বাভাবিক জীবন যাপন করছেন। পার করেছেন জীবনের ৬২টি বছর। চুমকি বলেন, এলাকার লোকজন তাকে দেখভাল করেন। কাজের প্রয়োজনে ডাকলে তাদের কাজ করে দেন, তারাও আমাকে উপযুক্ত সম্মানি দেন। সারাদেশে তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠির কাজ কর্মে মানুষের মাঝে অসন্তোষ্টি থাকলেও চুমকি তাদের বিষয়ে বলেন এর জন্য পরিবার ও সমাজ অনেকটা দায়ী। পরিবারের আদর যত্ন না পেয়ে এবং সমাজে তাদেরকে সম্মান না দেওয়ায় এমনটা হচ্ছে। উপযুক্ত পরিবেশ ও সম্মান পেলে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষও সমাজ এবং দেশের সেবায় কাজ করতে পারে। তিনি উদাহরন টেনে বলেন, ঝিনাইদহের তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ নজরুল ইসলাম ঋতু ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে জনসেবায় কাজ করে যাচ্ছেন। বর্তমানে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুরে তৃতীয় লিঙ্গের আনোয়ারা ইসলাম রানী এমপি নির্বাচনে অংশগ্রহন করছেন। চুমকি দাবী করেন সারাদেশেরর তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীকে পুনর্বাসন ও প্রশিক্ষনের আওতায় আনলে তারা সমাজের জন্য কিছুএকটা করতে পারবে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার অফিসার মো: খবিরুল আহসান জানান, তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠির জন্য সরকারের নানা কর্মসুচী রয়েছে। আবাসনের মাধ্যমে তাদের পুর্নবাসনের সুযোগ রয়েছে এবং সময়ে সময়ে তাদের বিভিন্ন বিষয়ে এলাকাভিত্তিক প্রশিক্ষনও দেয়া হয়। তাছাড়া তাদের সরকারী ভাতাও প্রদান করা হয়।





