
শেখ মাসুম বিল্লাহ,ডুমুরিয়া (খুলনা) খুলনা:
একদিনে সংঘটিত পৃথিবীর বৃহত্তম গণহত্যার নাম হিসেবে ইতিহাসে ঠাঁই পেয়েছে ভিয়েতনামের মাইলাই। মাইলাইয়ের গণহত্যায় মারা যায় প্রায় ১৫০০ মানুষ। আর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে খুলনার চুকনগরে একদিনেই গণহত্যার শিকার হয়েছে কমপক্ষে ১০ হাজারের কাছাকাছি মানুষ। তবু পৃথিবীর কোনো ইতিহাসে এই গণহত্যার স্থান মেলেনি। এমনকি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসেও নেই ডুমুরিয়ার চুকনগরের গণহত্যার কথা! চুকনগরের গণহত্যা কি তাহলে কথার কথা?বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্থানী হায়েনাদের নির্বিচার হত্যাকাণ্ড এবং পরিকল্পিত নারী নির্যাতনসহ জ্বালাও-পোড়াও নীতির ফলে মার্চ মাসের শেষ থেকেই প্রাণভয়ে ভারতের সীমান্ত অতিক্রম করতে শুরু করে লাখো মানুষ, যা ছিল বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দেশান্তরের ঘটনা।
ভিটেমাটি, সহায়-সম্বল ফেলে শিশু, নারী, বৃদ্ধ, যুবকদের দেশত্যাগ সম্ভব হয়েছিল তখনকার ভারতনেত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী সরকারের সময়োচিত সিদ্ধান্তে। ভারত সরকার বর্ডার খুলে দেয়, লক্ষ লক্ষ শরণার্থীকে আশ্রয় এবং তাদের নিরাপত্তা দান করে।
ঠিক সেই দুঃসময়ে সংঘটিত হয় খুলনার ডুমুরিয়ার চুকনগরের নৃশংসতম গণহত্যা! হতাহতের সংখ্যার দিক থেকে যাকে মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে বড় ও ভয়ংকর ট্রাজেডি বলে চিহ্নিত করা যায়। কারণ একদিনে, একটিমাত্র জায়গায় এবং ঠাণ্ডা মাথায় এত বিপুলসংখ্যক মানুষকে হত্যা করা হয়, যার নজির ইতিহাসে খুব বেশি নেই।
খুলনা, যশোর ও সাতক্ষীরার সংযোগস্থল এই চুকনগর ভারতীয় সীমান্তের নিকটবর্তী হওয়ায় স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু হবার পর বিভিন্ন স্থান থেকে লোকজন সীমান্ত অতিক্রমের জন্য এখানে এসে জড়ো হয়। স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শীদের মাধ্যমে জানা যায়, খুলনার বিভিন্ন থানার লোকজন ছাড়াও বাগেরহাট, পিরোজপুর, যশোর, গোপালগঞ্জ জেলাসহ নৌপথ সংযুক্ত আশেপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রাণভয়ে পালানো ভীতসন্ত্রস্ত হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষেরা ডুমুরিয়া চুকনগর হয়ে নদীপথে, নৌকাযোগে, কেউবা আবার সড়ক পথেও ছুটছিল সীমান্তবর্তী পশ্চিমবঙ্গের দিকে।
তৎকালীন জামায়াতের অন্যতম শীর্ষনেতা খুলনার মওলানা ইউসুফের নেতৃত্বে ৭১’এর ৫ মে গড়ে ওঠে রাজাকার বাহিনী। এরপর থেকে খুলনা শহরসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় ত্রাসের মাত্রা বেড়ে যায়। রাজাকাররা মুক্তিবাহিনীর সদস্য সন্দেহে যাকে-তাকে ধরে এনে ‘কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে’ নিয়ে অত্যাচার চালায়, হত্যা করে, সন্দেহভাজন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ঘরবাড়ি লুটসহ হত্যা, নির্যাতন ও নারী নিগ্রহ চালাতে থাকে। এরই মধ্যে আসে ১৫ মে। খবর ছড়িয়ে পড়ে পাকিস্তানি সৈন্যরা আসছে লোকজন ধরতে, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিতে। ফলে ভয়ের মাত্রা দ্বিগুণ হয়।
প্রাণের মায়ায় ভিটেমাটি ছেড়ে সবকিছু ফেলে হাজার হাজার গ্রামবাসী নদী পেরিয়ে ভারতে যাওয়ার লক্ষ্যে জড়ো হয় ডুমুরিয়ার চুকনগরে। যাতে তারা সাতক্ষীরার সড়ক ধরে বর্ডার পাড়ি দিতে পারে। ফলে বিশাল এক জনগোষ্ঠীর সম্মিলন ঘটে এই এলাকায়। তখনকার চুকনগর নদীবেষ্টিত ছিল। দুর-দুরান্ত থেকে ভদ্রা ও ঘ্যাংরাইল নদীপথে প্রায় ৩০- ৪০ হাজার মানুষ চুকনগরে এসে জড়ো হয়।
ভয় আর উৎকন্ঠা নিয়ে এসব মানুষেরা চুকনগর বাজার, খেলার মাঠ, স্কুল, পুটিমারীর বিল, পাতাখোলার বিল, মালতিয়ার বিল, রায়পাড়া, বেহারাপাড়া, দাসপাড়া, তাতিপাড়া সহ ভদ্রা নদীতে নৌকায় বিপুল সংখ্যক মানুষ ভারতের ওপারে পার হওয়ার জন্য অপেক্ষায় ছিলেন। নদীর পাশে ছিল মন্দির। তার পাশে ছিল বিশাল বটগাছ। চুকনগর বাজারের আশেপাশের গোটা এলাকা জুড়েই ছিল মানুষ আর মানুষ। ভারতে যাওয়ার পথে ক্লান্ত লোকজন যখন একটু বিশ্রাম নিচ্ছিলেন এবং অনেকে দুপুরবেলার খাবার তৈরী করছিলেন ঠিক তখনই পৈশাচিক আক্রমণ! শোনা যায় স্থানীয় ও সীমান্তবর্তী একটি দালালচক্র প্রথম দিকে টাকার বিনিময়ে অসহায় মানুষদের ভারতে যাওয়ায় সহযোগিতা করতো। পরবর্তীতে এই দালালচক্র ও মুসলিম লীগের নেতাদের যোগসাজশে পাকিস্থানি আর্মিদের এনে সুপরিকল্পিতভাবে এই সর্ববৃহৎ নির্মম গণহত্যা সংগঠিত করেছিল!
লোকমুখে শোনা যায়, একদিন নদী পার হবার সময় এক বিহারী খানের সঙ্গে নদী পারাপারের মূল্য নিয়ে কয়েকজন বাঙালির কিছু কথা কাটাকাটি হয়। ফলে সেই বিহারী “সকলকে দেখে নেয়া হবে” বলে হুমকি দেয়। এবং পরবর্তীতে সেই “দেখে নেয়ার” ফলশ্রুতিতেই সেই বিহারী খান হানাদারদের খবর দিয়েছিলো বলে জানা যায়। স্থানীয় সহযোগীরাও এই হত্যাকান্ডে ইন্ধন যুগিয়েছিল। ৭১’র ২০ মে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে দুইটি ট্রাক ও জিপে চেপে এগিয়ে আসে পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার মোহাম্মদ হায়াতের নেতৃত্বে এক মিলিটারি কনভয়। সঙ্গে পথপ্রদর্শক রাজাকার ও কয়েকজন বিহারী। হাতে লাইট মেশিনগান ও সেমি- অটোমেটিক রাইফেলসহ নানা মারণাস্ত্র। তারা চুকনগর বাজারের পাশে ঝাউতলায় এসে দাঁড়ায়, এবং এটি নিশ্চিত হয় যে, অবরুদ্ধ এই জনগোষ্ঠীর কেউ সশস্ত্র নয়, বরং দেশ ছেড়ে পালাতেই তারা সমবেত হয়েছেন।
একটি গাড়ি বাজারের দিকে এবং অন্য একটি গাড়ি পাতাখোলা বিল ও মালতিয়ার দিকে সরু রাস্তায় ঢুকে পড়ে। কিছুদূর যেতেই পাটক্ষেতে কাস্তেহাতে কর্মরত চিকন মোড়লকে কথা বলতে বলতেই প্রথম গুলি করে। তার ছেলে এরশাদ আলি মোড়লের ভাষ্যে সেই নির্মম হত্যাকান্ডের বর্ণনা পাওয়া যায়। এরপর রাস্তার দুপাশে, বিলের মধ্যে, নদীর পাশে নৌকার মধ্যে, মন্দিরে, গাছতলায় আশ্রয় নেয়া হাজার হাজার ভারতগামী নিরস্ত্র অসহায় মানুষের উপর নির্বিচারে ব্রাশ ফায়ার চালায়! থেমে থেমে এই গুলিবর্ষণ চলে বেলা ৩টা পর্যন্ত। প্রত্যক্ষদর্শী, যারা কোনোভাবে বেঁচে গেছেন, তাদের বয়ান এরকম- “ওরা পশুপাখির মতো গুলি করে মানুষ মারছিলো, উন্মত্ত মাতালের মতো গুলি ছুড়ছিলো। অসহায় হয়ে, মাটিতে শুয়ে সে দৃশ্য দেখতে হয়েছে আমাদের, ভাগ্যগুণে বেঁচে গেছি।”
শুধু এই নয়, সৈন্যদের নির্বিচার গুলি থেকে বাঁচতে বহু মানুষ নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েন, কেউ গাছে চড়েন, পুকুরে, ডোবায় লুকানোর চেষ্টা করেন; দিগ্বিদিক ছুটাছুটি করতে থাকেন বাঁচার আশায়। সব জায়গাতেই নির্বিচার গুলি চালায় উন্মত্ত সৈন্যরা- রক্তাক্ত হয়ে ওঠে নদীর পানি। চারদিকে তখন কেবল লাশের স্তূপ, রক্তের স্রোত, যা নামতে থাকে নদীর পানিতে। বাতাস ভারী হয়ে ওঠে হাজারও নারী-পুরুষ-শিশু-বৃদ্ধের আর্তনাদে।
অনেক শিশুর মায়ের বুকের দুধ খাওয়া অবস্থায় চালানো হয় গুলি। ঘাতকের বুলেট মায়ের বুকে বিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছে মা! কিন্তু, অবুঝ শিশু তখনও অবলীলায় মায়ের স্তন মুখের মধ্যে রেখে ক্ষুধা নিবারণের ব্যর্থ চেষ্টা করেছে! এ হত্যাকাণ্ডে সর্বাধিক মারা গেছেন হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা, যারা পরিবার-পরিজন নিয়ে দেশত্যাগের চেষ্টা করছিলেন। সৈন্যরা চলে যাওয়ার পর স্থানীয়রা শত শত লাশ নদীতে ফেলেছে, মাটি চাপা দিয়েছে। একাধিক গবেষক দল, সাংবাদিক, অনুসন্ধান ও গণহত্যা পর্যবেক্ষক পরবর্তীকালে বিস্তারিত বিবরণ খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করেন চুকনগর গণহত্যার। প্রতিটি অনুসন্ধানে লোমহর্ষক নৃশংসতার বিবরণ মেলে। সে বিবরণ এতটাই হৃদয়বিদারক যে চুকনগরের গণহত্যাকে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর হাতে পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সহজেই তুলনা করা চলে, যদিও চুকনগরে মৃত ও আহতের সংখ্যা অনেক বেশি।
চুকনগর গণহত্যায় নিহতদের সঠিক সংখ্যা নির্ণয় করা না গেলেও প্রতক্ষদর্শীদের মতে মৃতের সংখ্যা ৮ থেকে ১০ হাজার। কোনো কোনো পরিবারের সকল সদস্যই নিহত হয়েছেন, কোনো পরিবারের একাধিক নারী পুরুষ, শিশু নিহত হয়েছেন! একাত্তরের ২০ মে চুকনগরের গণহত্যাযজ্ঞ থেকে বেঁচে যাওয়া মানুষেরা আজও সেই যন্ত্রণা নিয়ে কেউ কেউ বেঁচে আছেন। এই দিনটি এলে স্বজন হারানোর ব্যথায় তাঁরা স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন। পাকিস্থানি হায়েনা ও তাদের এদেশীয় দোসরদের প্রতি ঘৃণায় বুক ভারী হয়ে ওঠে।
সেই সময়ের তরুণ প্রত্যক্ষদর্শী, ‘চুকনগর গণহত্যা ৭১ স্মৃতি রক্ষা পরিষদ’ এর সভাপতি চুকনগর কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ এবিএম শফিকুল ইসলাম বলেন, এই সংখ্যা কোনক্রমে দশ হাজারের কম নয়, বরং বেশী বলে মনে করেন। সেই হত্যাকান্ডের লাশ ফেলেছিলেন কয়েকজন। তাদের মধ্যে স্থানীয় কাওসার আলী, দলিল উদ্দীন, আনসার সরদার ও ইনছান সরদার। তিনি বলেন, এলাকার ওহাব মোল্লা তাদেরকে লাশগুলো ভদ্রা নদীতে ফেলার কথা বলেন। পাকিরা আদেশ জারি করেছিল, সব লাশ নদীতে ফেলে গ্রাম সাফ-সুতরো করতে হবে। বাঁশের মাঝে লাশ রেখে দুইজন টেনে আবার লাশের পা ধরে টেনে-হিচড়ে নদীতে ফেলা হয়। লাশের সংখ্যা দশ-বারো হাজারের কম হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাদের একজন বিয়াল্লিশ শ’ পর্যন্ত লাশ গুনেছিল। দুর্গন্ধে আর গুণতে পারেনি। লাশের গন্ধে নদীর পানিতে দুর্গন্ধ হয়। অনেক লাশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল আশে-পাশের বিলে! নদীতে, পুকুরে, ডোবায় অগণিত লাশ ভাসছিল! ঝোপঝাড়, বাগানে, গর্তে অসংখ্য লাশ পড়ে ছিল!
শোনা যায়, লাশ সরানো জন্য প্রতি লাশের জন্য নাকি ৫০ পয়সা বরাদ্দ করা হয়েছিল। তবে সেই পয়সা না পেলেও অনেকেই লাশের সাথে থাকা জামা কাপড়, বোচকা, থলের মধ্যে টাকাপয়সা এবং সোনার অলঙ্কার পেয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে পাতাখোলা বিলসহ পাশ্ববর্তী অনেক জায়গায় মানুষের হাড়ের বিভিন্ন অংশ পাওয়া গিয়েছে। চুকনগর কলেজ নির্মাণের সময়ও সেখানে মানুষের হাড় পাওয়া গেছে।
পৃথিবীর ইতিহাসে জঘন্যতম যেসব গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে, তার মধ্যে খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগরের গণহত্যা অন্যতম। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ এর ২০ মে পাকিস্তানি বর্বর সেনা ও তাদের দোসররা নির্মম এই হত্যাকাণ্ড ঘটায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে চুকনগরের গণহত্যা এক জঘন্যতম ও নারকীয় হত্যাকান্ড হিসাবে পরিচিত। আমাদের দুর্ভাগ্য, বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্র’র ১৫ খণ্ডের কোথাও চুকনগরের ইতিহাস নেই! স্বাধীনতার ৫০ বছর পার হলেও এই সর্ববৃহৎ চুকনগর গণহত্যার তেমন কোনো স্বীকৃতিই নেই! যারা এই নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল সেই গণহত্যাকারীদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায়নি! এমনকি সেই ঘাতক দলের নেতা পাকিস্তানি ব্রিগেডিয়ার মোহাম্মদ হায়াত, যুদ্ধ শেষে সেও ফিরে গেছে পাকিস্তানের মাটিতে।
২০০৫ সালের পর চুকনগর গণহত্যাস্থলে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মিত হলেও এখনও পূর্ণাঙ্গতা পায়নি এবং সেটি এখনও পর্যন্ত রয়েছে অরক্ষিত ও অবহেলায়। এ জন্য অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এলাকার মুক্তিযোদ্ধা সহ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কাছে চুকনগর গণহত্যার স্মৃতি আগামী প্রজন্মকে জানানোর জন্য একটি জাদুঘর ও লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে আসছেন।
চুকনগর গণহত্যায় শহীদদের প্রতি এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সকল শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।





