নীলফামারীতে গ্রাহকদের প্রায় আড়াই কোটি টাকা নিয়ে উধাও নৈশপ্রহরী

0
13

নীলফামারী জেলা প্রতিনিধি

নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার সোনালী ব্যাংকের একটি শাখায় অর্ধশতাধিক গ্রাহকের প্রায় আড়াই কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে ব্যাংকের নৈশপ্রহরী ফিরোজ মিয়ার বিরুদ্ধে। গত ২০ জুলাই থেকে তিনি নিখোঁজ রয়েছেন। এ ঘটনায় গ্রাহকদের মধ্যে চরম উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে।

কিশোরগঞ্জ সোনালী ব্যাংক শাখা’র ব্যবস্থাপক পংকজ কান্তি রায় বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, ফিরোজ মিয়ার নিখোঁজের ঘটনায় থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকজন গ্রাহককে ১৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা ফেরত দেওয়ার কথা জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন আমি জানিনা। হয়েছে বলেও জানান তিনি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কিশোরগঞ্জ সদর ইউনিয়নের ইসমাইল দোলাপাড়া গ্রামের কছির উদ্দিনের ছেলে ফিরোজ মিয়া প্রায় ১০-১৫ বছর ধরে ওই শাখায় নৈশপ্রহরী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তবে দায়িত্বের বাইরে গিয়ে তিনি গ্রাহকদের অ্যাকাউন্ট খোলা, ঋণের কাগজপত্র প্রস্তুত, টাকা জমা ও উত্তোলনসহ বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করতেন।

দীর্ঘদিন এভাবে কাজ করার ফলে গ্রাহকদের কাছে তিনি বিশ্বস্ত হয়ে ওঠেন। অভিযোগ রয়েছে, ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা নিজেদের দায়িত্বের বাইরে গিয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজও ফিরোজের মাধ্যমে করাতেন। একপর্যায়ে ব্যাংকের গ্রাহকদের কাছে ফিরোজই হয়ে ওঠেন আস্থার প্রধান ব্যক্তি।

ভুক্তভোগী শরিফুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, সিসি লোন করে দেওয়ার কথা বলে ফিরোজ তার কাছ থেকে একটি চেক নেন। পরে ওই চেক ব্যবহার করে তার হিসাব থেকে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়।

কিশোরগঞ্জ সরকারি ডিগ্রি কলেজের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী মশিয়ার রহমান বলেন, ফিরোজ তার ব্যাংক হিসাব থেকে ৭০ হাজার টাকা তুলে নিয়েছেন।

অন্য গ্রাহক দিদার রসুল জানান, গত ২০২২ সালের ২৮ নভেম্বর হিসাবে জমা দেওয়ার জন্য তিনি ফিরোজকে ৪ লাখ টাকা দেন। পরে জানতে পারেন, ওই তারিখে তার হিসাব থেকে টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। এরপর চলতি বছরের এপ্রিল মাসে আরও আড়াই লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। সব মিলিয়ে তার সাড়ে সাত লাখ টাকা খোয়া গেছে বলে দাবি করেন তিনি।

গ্রাহক শফিকুল ইসলাম শফি বলেন, ঋণ করিয়ে দেওয়ার কথা বলে ফিরোজ বিভিন্ন গ্রাহকের কাছ থেকে ফাঁকা চেকের পাতা, জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি, অলিখিত স্ট্যাম্প ও ছবি নিয়ে রাখতেন। পরে তাদের নামে বড় অঙ্কের ঋণ অনুমোদন করিয়ে নামমাত্র টাকা দিয়ে বাকিটা আত্মসাৎ করা হতো বলে দাবি করেন তিনি।

তার অভিযোগ, কয়েক বছর পর ব্যাংক থেকে নোটিশ পাওয়ার পর গ্রাহকরা ঋণের প্রকৃত পরিমাণ জানতে পারেন। এরপর অনেকে জমি, ঘরবাড়ি ও অন্যান্য সম্পদ বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করতে বাধ্য হয়েছেন।

গ্রাহক তহুরা বেগম জানান, তিনি ওই শাখায় একটি এফডিআর করেছিলেন। মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পর টাকা উত্তোলনের জন্য ব্যাংকে গেলে ফিরোজ তাকে চেকবই দিয়ে যেতে বলেন। পরে ব্যাংকে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, তার হিসাব শূন্য।

অন্যদিকে, গ্রাহক আরজিনা বেগম অভিযোগ করেন, ফিরোজ তার বেতনের ২৮ হাজার টাকা তুলে নিয়েছেন।

ভুক্তভোগীদের দাবি, আত্মসাতের অর্থ দিয়ে ফিরোজ বিপুল পরিমাণ জমি কিনেছেন। এ ছাড়া প্রায় ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে তিনি একটি বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ করেছেন বলেও অভিযোগ করেন তারা। তবে এসব সম্পদের বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো সরকারি নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করতে তদন্ত প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

ফিরোজের বাবা কছির উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, তার ছেলে ব্যাংকের অনেক গ্রাহকের টাকা তুলে নিয়েছে। এর মধ্যে কয়েকজন গ্রাহকের ১৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যাংক ব্যবস্থাপকের মাধ্যমে ফেরত দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় আড়াই কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে বলে তিনি শুনেছেন।

ব্যাংক ব্যবস্থাপক পংকজ কান্তি রায় বলেন, ফিরোজ মিয়া গত ২০ জুলাই থেকে হঠাৎ ব্যাংকে আসা বন্ধ করে দেন। পরিবারের সদস্যরা জানান, জরুরি কাজে তিনি ঢাকায় গেছেন। পরে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে তাকে না পেয়ে বাড়িতে নোটিশ পাঠানো হয়। এরপর ১০-১৫ জন আমানতকারী ব্যাংকে এসে হিসাবের টাকা না পাওয়ার অভিযোগ করলে বিষয়টি জানা যায়।

তিনি আরও জানান, গ্রাহকদের আমানত খোয়া যাওয়ার প্রকৃত সংখ্যা ও টাকার পরিমাণ যাচাই করা হচ্ছে। এ মুহূর্তে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া সম্ভব নয় বলেও জানান তিনি।

কিশোরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল গফুর বলেন, সোনালী ব্যাংকের নৈশপ্রহরী ফিরোজ মিয়া ২০ জুলাই থেকে নিখোঁজ রয়েছেন। তার নিখোঁজের ঘটনায় ব্যাংক ব্যবস্থাপক পংকজ কান্তি রায় থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছেন।

তবে গ্রাহকদের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ও সম্পদ অর্জনের বিষয়টি তদন্ত শেষে প্রকৃত তথ্য জানা যাবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।


নীলফামারীতে গ্রাহকদের প্রায় আড়াই কোটি টাকা নিয়ে উধাও নৈশপ্রহরী

Share this news as a Photo Card

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here