
অনলাইন ডেস্ক
বয়স প্রায় ৯০ বছর। দিনের আলোতেও চোখে ঝাপসা দেখেন, সন্ধ্যা নামলেই নেমে আসে ঘন অন্ধকার। শরীরের শক্তি হারিয়েছে বয়সের ভারে, চোখের দৃষ্টিও ক্ষীণ। নেই নিরাপদ আশ্রয়, নেই নিয়মিত খাবারের নিশ্চয়তা। মাথা গোঁজার একমাত্র ঠাঁই পুকুরের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা নড়বড়ে কাঠের একটি পরিত্যক্ত দোকানঘর। সেটিও যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়ে ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা। এমনই দুর্বিষহ জীবন কাটছে যশোরের মণিরামপুর উপজেলার শ্যামকুড় ইউনিয়নের আগরহাটি গ্রামের অসহায় বৃদ্ধা নবীরুন্নেসার।
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে যেখানে একটু নিরাপদ আশ্রয়, দুবেলা খাবার আর মানুষের সামান্য ভালোবাসা পাওয়ার কথা, সেখানে প্রতিটি দিনই তাঁর কাছে যেন বেঁচে থাকার এক কঠিন সংগ্রাম। চোখে ভালোভাবে দেখতে না পারায় নিজের প্রয়োজনটুকুও মেটাতে পারেন না তিনি। কেউ খাবার দিলে খান, না দিলে অনেক সময় খালি পেটেই কাটে দিন-রাত। বয়সের ভার, দারিদ্র্য আর নিঃসঙ্গতার সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে বেঁচে আছেন এই বৃদ্ধা।
স্থানীয় এক ব্যক্তির দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আগরহাটি গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, একাধিক মালিকানাধীন একটি বড় পুকুরের এক কোণে কাঠের তৈরি ছোট্ট একটি দোকানঘর সামনের দিকে হেলে পড়েছে। ঘরটির খুঁটি নড়বড়ে, কাঠের পাটাতনও জরাজীর্ণ। বাইরে থেকে দেখলেই বোঝা যায়, যেকোনো সময় সেটি ভেঙে পুকুরে পড়ে যেতে পারে। অথচ এই বিপজ্জনক ঘরটিই নবীরুন্নেসার একমাত্র আশ্রয়স্থল।
ঘরের ভেতরে নেই কোনো খাট, বিছানা কিংবা প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র। নেই পর্যাপ্ত বালিশ, কাঁথা বা নিরাপত্তার ব্যবস্থা। নিজের স্মৃতি জড়িয়ে থাকা কয়েকটি প্যাকেটই ঘুমানোর সময় বালিশ হিসেবে ব্যবহার করেন তিনি। ঘরের এক পাশে রাখা কয়েকটি প্লাস্টিকের জারে রয়েছে মুড়ি। সামান্য এই খাবার আর প্রতিবেশীদের দেওয়া আহারেই কোনো রকমে চলে তাঁর জীবন।
কথা বলতে গিয়ে বারবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বৃদ্ধা নবীরুন্নেসা। অসহায় কণ্ঠে নিজের দুর্দশার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “আমি খাব কী, থাকব কোথায়? ওরা দোকানটা দিয়েছিল বলে এত দিন বেঁচে আছি। কিন্তু এখন সেটাও ভেঙে পড়ার অবস্থায়। আমি আর কোথায় থাকব?”
বৃদ্ধার এই প্রশ্নের উত্তর যেন কারও কাছেই নেই। যে ঘরটুকু তাঁর মাথা গোঁজার শেষ সম্বল, সেটুকুও এখন নিরাপদ নয়। পুকুরের পানির ওপর ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা সেই ঘরে রাত কাটানোর সময় কতটা আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে তাঁকে যেতে হয়, তা সহজেই অনুমেয়।
নবীরুন্নেসার জীবনসংগ্রামের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ বেদনার ইতিহাস। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর স্বামী মো. হবিবুর রহমান নিখোঁজ হন। তিনি কোথায়, কীভাবে মারা গেছেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য আজও জানা যায়নি। স্বামীকে হারানোর পর দীর্ঘদিন খোঁজাখুঁজি করেও তাঁর সন্ধান পাননি নবীরুন্নেসা। একসময় দুই মেয়েকে নিয়ে বেনাপোলের বারোপোতা এলাকা ছেড়ে ফিরে আসেন নিজের বাবার বাড়ি মণিরামপুরের শ্যামকুড় ইউনিয়নের আগরহাটি গ্রামে।
বাবার বাড়িতে পৈতৃক সম্পত্তির যে সামান্য অংশ তাঁর ভাগে পড়েছিল, তা দিয়ে দুই মেয়ের বিয়ে দেন। মেয়েদের সংসার গুছিয়ে দিতে গিয়ে নিজের সম্বলটুকুও শেষ হয়ে যায়। এরপর থেকেই শুরু হয় তাঁর নিঃস্ব জীবনের নতুন অধ্যায়। স্বামীহারা এই নারীকে শেষ পর্যন্ত নির্ভর করতে হয় ভাই ও ভাইপোদের সহায়তার ওপর।প্রতিবেশীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ২০ থেকে ২২ বছর আগে তাঁর এক ভাইপো পরিত্যক্ত কাঠের দোকানটি এনে দেন। বসতভিটার নিজস্ব জমি না থাকায় আগরহাটি গ্রামের ওই পুকুরের এক কোণে তাঁকে থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। এর আগে তিনি ভাইপোদের বাড়িতে রাত কাটাতেন। সেই থেকে পুকুরের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা নড়বড়ে কাঠের দোকানটিই তাঁর স্থায়ী আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে।
বৃদ্ধার ব্যক্তিগত জীবনের ক্ষতও কম নয়। দুই মেয়ের মধ্যে একজন শ্বশুরবাড়িতে যৌতুকের চাপ, নির্যাতন ও দারিদ্র্যের কারণে মানসিক কষ্টে প্রায় ২০ বছর আগে আত্মহত্যা করেন বলে আক্ষেপের সঙ্গে জানান নবীরুন্নেসা। অন্য মেয়ের সংসারেও আর্থিক টানাপোড়েন রয়েছে। ফলে মেয়ের কাছ থেকেও নিয়মিত সহযোগিতা পাওয়ার সুযোগ নেই। নিজের অসহায়ত্বের পাশাপাশি সন্তানের দুরবস্থাও তাঁকে প্রতিনিয়ত কষ্ট দেয়।
বর্তমানে আশপাশের কয়েকটি পরিবারের মানুষ সামর্থ্য অনুযায়ী তাঁকে খাবার দিয়ে সহযোগিতা করেন। কিন্তু সেই সহযোগিতা নিয়মিত নয়। কোনো দিন খাবার জোটে, কোনো দিন জোটে না। চোখে ভালোভাবে দেখতে না পারায় বাইরে গিয়ে কাজ করা কিংবা কারও কাছে সাহায্য চাওয়াও তাঁর পক্ষে কঠিন। ফলে অন্যের দয়া ও সহযোগিতার ওপর নির্ভর করেই চলছে তাঁর বেঁচে থাকা।
নবীরুন্নেসার সবচেয়ে বড় আকুতি চোখের দৃষ্টি ফিরে পাওয়া। তিনি মনে করেন, চোখে দেখতে পারলে অন্তত মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে নিজের খাবারের ব্যবস্থা করতে পারতেন। অসহায় কণ্ঠে তিনি বলেন, “চোখে দেখতে পেলে কারও বোঝা হয়ে থাকতে হতো না। মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হলেও খেয়ে-পরে বেঁচে থাকতে পারতাম।”
তবে তাঁর চোখের সমস্যার প্রকৃত কারণ কী, চিকিৎসায় দৃষ্টিশক্তি কতটা ফেরানো সম্ভব কিংবা এ জন্য কী ধরনের চিকিৎসা প্রয়োজন—তা এখনো জানা যায়নি। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ পেলে তাঁর চিকিৎসার সম্ভাবনা যাচাই করা যেতে পারে।
স্থানীয় ওয়ার্ড বিএনপির নেতা ও সম্ভাব্য ইউপি সদস্য পদপ্রার্থী মো. মামুনুর রশীদ মিন্টু জানান, নবীরুন্নেসা সম্পর্কে তাঁর ফুফু। তাঁরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করার চেষ্টা করেন। তবে বৃদ্ধার স্থায়ী আশ্রয় ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা তাঁদের একার পক্ষে কঠিন। তিনি বলেন, “উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা যদি মানবিক দৃষ্টিতে বিষয়টি দেখেন এবং প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেন, তাহলে জীবনের শেষ বয়সে আমার ফুফু একটু স্বস্তিতে থাকতে পারবেন।”
নবীরুন্নেসার জীবন যেন দীর্ঘ বঞ্চনা আর হারানোর এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বামীকে হারানো, দুই মেয়ের ভবিষ্যৎ গড়তে নিজের সম্বল হারানো, এক মেয়ের অকালমৃত্যুর শোক এবং শেষ বয়সে দৃষ্টিশক্তি হারানোর যন্ত্রণা—সবকিছুর ভার নিয়েই দিন পার করছেন তিনি। অথচ তাঁর চাওয়া খুব বেশি নয়; নিরাপদে মাথা গোঁজার মতো একটি আশ্রয়, নিয়মিত খাবার এবং সম্ভব হলে চোখের চিকিৎসার ব্যবস্থা।
সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, মানবিক সংগঠন এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর সমন্বিত উদ্যোগে এই বৃদ্ধার জীবন কিছুটা হলেও বদলে যেতে পারে। সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় তিনি কোনো ভাতা বা অন্যান্য সহায়তা পাচ্ছেন কি না, তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি। পাশাপাশি তাঁর বসবাসের ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ বিবেচনায় নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নবীরুন্নেসার প্রতিটি দিন কাটছে অনিশ্চয়তা আর অসহায়ত্বের মধ্যে। যে বয়সে একজন মানুষের প্রয়োজন হয় একটু যত্ন, নিরাপত্তা ও মানসিক প্রশান্তি, সে বয়সে তাঁকে রাত কাটাতে হচ্ছে পুকুরের ওপর হেলে পড়া একটি নড়বড়ে কাঠের দোকানে। সেখানে নেই নিশ্চিন্তে ঘুমানোর পরিবেশ, নেই আগামী দিনের খাবারের নিশ্চয়তা।
নবীরুন্নেসার এই দুর্বিষহ জীবন কেবল একজন অসহায় বৃদ্ধার ব্যক্তিগত দুঃখের গল্প নয়; এটি সমাজের মানবিক দায়িত্ব ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। এখন দেখার বিষয়, তাঁর এই আকুতি সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, সমাজের বিত্তবান মানুষ ও মানবিক সংগঠনগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে কি না।
জীবনের শেষ দিনগুলো অন্তত নিরাপদে কাটুক-নবীরুন্নেসার এই ন্যূনতম চাওয়াটুকু পূরণে মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।













