হারিছ ও জোসেফ অসত্য তথ্য দিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট

0
147

হারিছ ও জোসেফ অসত্য তথ্য দিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট মিথ্যা তথ্য দিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও পাসপোর্ট করা আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ৷ অসত্য তথ্য দিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট নিজেদের নামের পাশাপাশি মা-বাবার নামও বদল করেছেন বহুল আলোচিত তিন সহোদরের দুজন; হারিছ আহমেদ ও তোফায়েল আহমেদ ওরফে জোসেফ। নিজেদের ছবি দিয়ে নতুন নাম আর ভিন্ন ঠিকানা ব্যবহার করে তাঁরা জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট সংগ্রহ করেছেন। নিয়ম অনুযায়ী, জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট করার সময় ব্যক্তিকে সশরীর হাজির থেকে ছবি তুলতে হয়।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, হারিছ আহমেদ জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও পাসপোর্ট নিয়েছেন মোহাম্মদ হাসান নামে। আর জোসেফ নিয়েছেন তানভীর আহমেদ তানজীল নামে। এ ধরনের কাজ জাতীয় পরিচয় পত্র নিবন্ধন আইন ও পাসপোর্ট অধ্যাদেশ অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তাঁদের আরেক ভাই আনিস আহমেদও একই রকম কাজ করেছেন কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
হারিছ ও জোসেফ দুটি খুনের মামলায় যথাক্রমে যাবজ্জীবন ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ছিলেন। তাঁদের আরেক ভাই আনিস আহমেদ একটি খুনের মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ছিলেন। ২০১৯ সালের ২৮ মার্চ হারিছ ও আনিসের সাজা মওকুফ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এর আগে মা রেনুজা বেগমের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জোসেফের সাজা মাফ করেছিলেন রাষ্ট্রপতি। জোসেফ তখন কারাগারে ছিলেন।
সম্প্রতি কাতারভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল আল-জাজিরায় প্রচারিত ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টারস মেন’ তথ্যচিত্রে হারিছ ও আনিসকে পলাতক আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। বাংলাদেশেও গত সোমবার পর্যন্ত সবাই জানত তাঁরা সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি। অনুসন্ধানে তাঁদের সাজা মওকুফের বিষয়টি বেরিয়ে আসে এবং গত মঙ্গলবার তা পত্রিকায় প্রধান প্রতিবেদন হিসেবে প্রকাশিত হয়।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরও এ বিষয়ে একই তথ্য প্রকাশ করেছে। এই তিন সহোদরের আরেক ভাই সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ। তিনিও মঙ্গলবার তাঁর ভাইদের সাজা মাফ পাওয়ার বিষয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন। দেশের একাধিক থানা ও আদালতের নথিপত্র, সাজা মওকুফ চেয়ে (জোসেফের জন্য) মায়ের করা আবেদন সহ সাজা মওকুফের সরকারি প্রজ্ঞাপনে হারিছ ও জোসেফের বাবার নাম আব্দুল ওয়াদুদ ও মায়ের নাম রেনুজা বেগম লেখা আছে। কিন্তু হারিছ যে জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট নিয়েছেন, তাতে বাবার নাম সুলেমান সরকার এবং মায়ের নাম রাহেলা বেগম উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু জোসেফের জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টে বাবার নাম সোলায়মান সরকার এবং মায়ের নাম ফাতেমা বেগম লেখা আছে। দুই ভাই পৃথক পৃথক স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা ব্যবহার করেছেন।
আদালতের নথি ও সরকারি প্রজ্ঞাপনে হারিছ, আনিস ও জোসেফের ঠিকানা লেখা আছে ডি/৯ নূরজাহান রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা ১২০৭। কিন্তু মোহাম্মদ হাসান নামে হারিছের করা জাতীয় পরিচয়পত্রে স্থায়ী ঠিকানা বলা হয়েছে মতলব উত্তর উপজেলা, চাঁদপুর। আর বর্তমান ঠিকানা লেখা আছে বাসা নং ২৮, ডি-১ ব্লক, নূরজাহান রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা। ২০১৪ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি এই নামে জাতীয় পরিচয়পত্র ইস্যু করা হয়৷ তানভীর আহমেদ তানজীল নামে জোসেফের করা জাতীয় পরিচয়পত্রে বর্তমান ঠিকানা দেখানো হয়েছে মিরপুর ডিওএইচএসের একটি বাসা। আর স্থায়ী ঠিকানা লেখা আছে ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট বাজার এলাকার একটি বাসা।
পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সূত্র জানায়, হারিছ ২০১৪ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি মোহাম্মদ হাসান নামে ঢাকার আগারগাঁও অফিস থেকে প্রথম পাসপোর্ট করান। তাতে জরুরি যোগাযোগ: ফাতেমা বেগম, আর-২৮ নূরজাহান রোড, মোহাম্মদপুর উল্লেখ করা হয়। ২০১৭ সালে তিনি ভিয়েনা থেকে আবেদন করে আবার পাসপোর্ট নেন। ২০১৯ সালে তিনি পাসপোর্টে নিজের ছবি বদল করেন। ২০২০ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি তাঁর নামে ১০ বছর মেয়াদি একটি ই-পাসপোর্ট ইস্যু করে পাসপোর্ট অধিদপ্তর।
একই সূত্র জানায়, জোসেফ প্রথম পাসপোর্ট নেন ২০১৮ সালের ১৩ মে, তানভীর আহমেদ তানজীল নামে। তাতে স্থায়ী ঠিকানা ছিল ১২৩/এ তেজকুনীপাড়া, তেজগাঁও, ঢাকা। আর বর্তমান ঠিকানা ছিল ৪০ খানপুর, নারায়ণগঞ্জ। বৈবাহিক অবস্থা অবিবাহিত। ওই বছরেরই ৪ জুন স্ত্রীর নাম যুক্ত করে তিনি পাসপোর্ট সংশোধন করান। ২০১৯ সালে পাসপোর্টে স্থায়ী ঠিকানা বদল করেন। ২০২০ সালের ৯ মার্চ তিনি ই-পাসপোর্ট নেন। এ সময় নিজের ছবি, স্থায়ী ঠিকানা ও জরুরি যোগাযোগের ঠিকানা পরিবর্তন করেন। এদের দুজনের পাসপোর্টের বিষয়ে কোনো অভিযোগ আসেনি। যে কেউ মিথ্যা তথ্য দিয়ে পাসপোর্ট নিলে বা এ বিষয়ে অভিযোগ এলে তা তদন্ত করে অধিদপ্তর আইনানুগ ব্যবস্থা নেয় এবং পাসপোর্ট বাতিল করে।
সেলিনা বানু, পাসপোর্ট অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পাসপোর্ট, ভিসা ও ইমিগ্রেশন) জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন আইন অনুযায়ী, জাতীয় পরিচয়পত্র পেতে উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে বা জ্ঞাতসারে কোনো মিথ্যা বা বিকৃত তথ্য দেওয়া অথবা তথ্য গোপন করা দণ্ডনীয় অপরাধ। এই অপরাধের শাস্তি অনূর্ধ্ব ১বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড। এই আইনের ১৮ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি জাতীয় পরিচয়পত্র জাল করলে বা জ্ঞাতসারে ওই জাতীয় পরিচয়পত্র বহন করলে তিনি সাত বছর কারাদণ্ড এবং অনধিক ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
আর পাসপোর্ট অধ্যাদেশের ১১ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত ভাবে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বা সঠিক তথ্য লুকিয়ে অন্য নামে পাসপোর্ট নিলে তা দণ্ডনীয় অপরাধ। এ অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি ৬মাসের কারাদণ্ড বা ২হাজার টাকা জরিমানা।
জানতে চাইলে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পাসপোর্ট, ভিসা ও ইমিগ্রেশন) সেলিনা বানু প্রথম আলোকে বলেন, দুজনের পাসপোর্টের বিষয়ে কোনো অভিযোগ আসেনি। তিনি বলেন, যে কেউ মিথ্যা তথ্য দিয়ে পাসপোর্ট নিলে বা এ বিষয়ে অভিযোগ এলে তা তদন্ত করে অধিদপ্তর আইনানুগ ব্যবস্থা নেয় এবং পাসপোর্ট বাতিল করে। জাতীয় পরিচয়পত্র করতে জন্মসনদ ও নাগরিকত্ব সনদ জমা দিতে হয়। তাতে ব্যক্তির নাম ও মা-বাবার নাম থাকে। তার ভিত্তিতেই জাতীয় পরিচয়পত্রে ব্যক্তিগত তথ্য যুক্ত হয়। তাই বেনামে জাতীয় পরিচয়পত্র করার ক্ষেত্রে এই দুটি সনদও অসত্য তথ্যের ভিত্তিতে করতে হয়।
ইচ্ছাকৃত ভাবে মিথ্যা তথ্য দেওয়া পাসপোর্ট অধ্যাদেশ ও জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন আইন অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ। কারণ, এর সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নটি জড়িত। যেসব কর্মকর্তা এ ধরনের বেআইনি কাজের সঙ্গে জড়িত, তাঁদেরও আইনের আওতায় আনা উচিত
জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন অনুযায়ী, জন্ম বা মৃত্যু নিবন্ধনের ক্ষেত্রে মিথ্যা তথ্য দিলে অনধিক ৫ হাজার টাকা জরিমানা অথবা অনধিক ১বছর বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান আছে। আর জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক এ কে এম হুমায়ূন কবীর গতকাল বুধবার মুঠোফোনে প্রথম আলোকে দেওয়া স্বাক্ষাতকারে বলেন, মিথ্যা তথ্য দিয়ে হারিছ ও জোসেফের পরিচয়পত্র নেওয়া বিষয়ক কোনো সংবাদ তাঁর চোখে পড়েনি। এ বিষয়ে তিনি আর কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য হারিছ ও জোসেফের পাসপোর্টের আবেদন ফরমে দেওয়া মোবাইল ফোন নম্বরে গতকাল কয়েকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। দুটি নম্বরই বন্ধ থাকায় তাঁদের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া প্রথম আলোর স্বাক্ষাতে বলেন, ইচ্ছাকৃত ভাবে মিথ্যা তথ্য দেওয়া পাসপোর্ট অধ্যাদেশ ও জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন আইন অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ। কারণ, এর সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নটি জড়িত। তিনি বলেন, যেসব কর্মকর্তা এ ধরনের বেআইনি কাজের সঙ্গে জড়িত, তাঁদেরও আইনের আওতায় আনা উচিত।


হারিছ ও জোসেফ অসত্য তথ্য দিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট

Share this news as a Photo Card

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here