
আব্দুর রহীম হাজারী,ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর প্রতিনিধি:
মুফতী আমিনী রাহ. সংগ্রামী এক আলেমের জীবন
মাওলানা শরীফ মুহাম্মাদ
তিনি হঠাৎ করে চলে গেলেন। সবাইকে হতবুদ্ধি, নির্বাক ও শোকবিদ্ধ করে চলে গেলেন। ঘরবাড়ি-ময়দান শূন্য করেই চলে গেলেন। ঝড়ের রাতে জাহাজ থেকে নাবিক নেমে গেলে যেমন হয়, গহীন অরণ্যে কাফেলার রাহবার নিখোঁজ হয়ে গেলে যেমন হয়—দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ ও আলেম সমাজের অবস্থা তার চলে যাওয়ায় তেমনই হয়েছে। গত ১২ ডিসেম্বর মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১২টা ২০ মিনিটে আমাদের ছেড়ে পরপারে চলে গেছেন মুফতী ফজলুল হক আমিনী।
জাতীয় ঈদগাহে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে তার নামাযে জানাযা অনুষ্ঠিত হয় বুধবার বিকাল সাড়ে তিনটায়। ওইদিন আসরের পর লালবাগ শাহী মসজিদের সামনের সংরক্ষিত করবস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
এক নজরে তার জীবনের দিকে তাকালে আমরা দেখব, তিনি ১৯৪৫ সালের ১৫ই নভেম্বর বি-বাড়ীয়া জেলার আমীনপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত ও দ্বীনদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বি, বাড়ীয়া জামেয়া ইউনুসিয়ায় প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি মুন্সিগঞ্জ জেলাধীন বিক্রমপুরের মোস্তফাগঞ্জ মাদরাসায় তিন বছর পড়াশুনা করেন। তারপর ১৯৬১ সালে রাজধানী ঢাকার ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জামেয়া কোরআনিয়া আরাবিয়া লালবাগ মাদরাসায় চলে আসেন। এখানে তিনি হযরত মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী রাহ. ও হযরত হাফেজ্জী হুজুর রাহ., কিংবদন্তী মুহাদ্দিস হযরত মাওলানা হেদায়েতুল্লাহ রাহ., শায়খুল হাদীস হযরত মাওলানা আজিজুল হক রাহ., আরেফ বিল্লাহ মাওলানা সালাহ উদ্দীন রাহ. এবং হযরত মাওলানা আব্দুল মজীদ ঢাকুবী রহ. -এর বিশেষ তত্ত্বাবধানে দাওরায়ে হাদীসের সনদ লাভ করেন। ১৯৬৯ সালে আল্লামা ইউসুফ বিন্নুরী [রহঃ]-এর কাছে হাদীস পড়ার উদ্দেশ্যে পাকিস্তান করাচী নিউ টাউন মাদরাসায় ভর্তি হন। সেখানে তিনি উলুমুল হাদীসের উপর পাঠ গ্রহণ করে দেশে ফিরে আসেন।
কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৭০ সালে। প্রথমে মাদরাসা-ই- নূরিয়া কামরাঙ্গীরচরে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ওই বছরই তিনি হজরত হাফেজ্জী হুজুর রাহ.-এর কন্যার সাথে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৭২ সালে মাত্র নয় মাসে তিনি কুরআন শরীফ হেফয করেন। এ সময় তিনি ঢাকার আলু বাজারে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। একই সাথে আলু বাজার মসজিদের খতীবের দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৯৭৫ সালে তিনি জামেয়া কুরআনিয়া আরাবিয়া লালবাগ মাদরাসার শিক্ষক ও সহকারী মুফতী নিযুক্ত হন। ১৯৮৪ সালে তিনি লালবাগ জামেয়ার ভাইস প্রিন্সিপাল ও প্রধান মুফতীর দয়িত্ব পান। ১৯৮৭ সালে হযরত হাফেজ্জী হুজুর রাহ.-এর ইন্তেকালের পর থেকে তিনি লালবাগ জামেয়ার প্রিন্সিপাল ও শায়খুল হাদীসের দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৩ সালে পান বড়কাটারা হোসাইনিয়া আশরাফুল উলুম মাদরাসার প্রিন্সিপাল ও মুতাওয়াল্লির দায়িত্ব। ইন্তেকালের আগ পর্যন্তই এই দুইটি মাদরাসার প্রিন্সিপালের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। পাশাপাশি ঢাকার কাকরাইল, দাউদকান্দির গৌরীপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বহু মাদরাসার প্রধান অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করেছেন।
মুফতী আমিনী রাহ.-এর বিশেষত্ব কী ছিল? তিনি একজন প্রজ্ঞাবান বড় আলেম ছিলেন। ঐতিহ্যবাহী দুটি বড় মাদরাসার প্রিন্সিপাল ও শায়খুল হাদীস ছিলেন। ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান হিসেবে সরব একজন ইসলামী রাজনীতিক ছিলেন। তার পরিচয় এতটুকুর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। গত দুই যুগ ধরে তিনি ছিলেন এদেশের ধর্মপ্রাণ-দেশপ্রেমিক মানুষ ও সর্বস্তরের আলেম সমাজের একজন প্রধান প্রতিনিধি। তিনি তাদের ভাই ছিলেন। তিনি তাদের দুঃখ ও দ্রোহের কণ্ঠ ছিলেন। তিনি তাদের বন্ধু, নেতা ও অভিভাবক ছিলেন। সঙ্কটকালে তার গমগমা কণ্ঠ আর হাতের আঙুলের দিকে তাকিয়ে থাকতেন তারা। আহা! এত সুন্দর করে জনসভা ও মাহফিলগুলোতে ইসলামের অতীত গৌরব, বীরত্ব, আশাব্যঞ্জকতা, উদ্দীপনা, আল্লাহনির্ভরতা আর সাহসের পঙক্তিমালা তিনি উচ্চারণ করতেন যে মুহূর্তের মধ্যেই লাখো মানুষের ছায়াচ্ছন্ন, চিন্তাক্লিষ্ট চেহারায় প্রত্যয় ও আশ্বাসের রোদ হেসে উঠত। তিনি তার বক্তব্যে পবিত্র কুরআন ও হাদীসের ব্যাখ্যা পেশ করতেন। তিনি বীর সালাহউদ্দিন আইয়ুবী, গাজী নুরুদ্দীন জঙ্গি রাহ.-এর অমিত সাহসের ইতিহাস উচ্চারণ করতেন। শাহ ওয়ালি উল্লাহ, সাইয়্যেদ আহমদ শহীদ, কাসেম নানুতুবী ও শায়খুল হিন্দ মাহমুদ হাসান রাহ.-এর জীবনব্যাপী সংগ্রামের দাস্তান শোনাতেন। শেখ সাদী, জালালুদ্দীন রূমী, আকবর এলাহাবাদী, ইকবাল, হালী, জিগার মুরাদাবাদী ও খাজা আজিজুল হাসান মজযুব রাহ.-এর শের আবৃত্তি করতেন। তার কণ্ঠের উঠানামায় লাখো মানুষের মজমা তরঙ্গের মতো দুলতে থাকতো। তিনি সাহসের কণ্ঠ ছিলেন। সংগ্রামের ময়দানে অবিচলতার পাহাড় ছিলেন।
আশির দশকের শুরু পর্যন্ত তিনি ছিলেন অতি মনোযোগী ও নীরবতাবাদী একজন মেধাবী আলেম-শিক্ষক। তার শিক্ষক ও অভিভাবক হযরত হাফেজ্জী হুজুর রাহ. তাকে রাজনীতিতে নামালেন। ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সেই যে নামলেন তিনি, আর সরে গেলেন না। তিনি যখন গেলেন তখন কোটি মানুষকে রাস্তায় রেখে একদমই তিনি চলে গেলেন।
নব্বই দশকের শুরুতে ভারতের উত্তর প্রদেশে বাবরি মসজিদ ধ্বংস করা হলে এই দেশে লংমার্চের ডাক দেয়া হয়। সেই লংমার্চ আন্দোলনের দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা ও প্রধান নির্বাহী ছিলেন মুফতী আমিনী রাহ.। তার শিক্ষক শায়খুল হাসীস আল্লামা আজিজুল হক রাহ. ছিলেন এ লংমার্চের আহ্বায়ক ও অভিভাবক। মুফতী আমিনী রাহ. ছিলেন এর কার্যনির্বাহী প্রধান। ১৯৯৪ সালে এক নাস্তিক মহিলা লেখক পবিত্র কুরআন পরিবর্তনের ডাক দিলে তিনি ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়েন। সারা দেশে ছুটে বেড়িয়ে আন্দোলন সংগঠিত করেন। হরতাল পালন করেন। সেই মুরতাদ মহিলা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়। ২০০১ সালে সব রকম ফতোয়া নিষিদ্ধ করার একটি রায় উচ্চ আদালত থেকে ঘোষিত হলে তিনি বিচারপতিকে মুরতাদ ঘোষণা করে ঝুঁকিপূর্ণ ও ঘটনাবহুল এক আন্দোলনে নেমে পড়েন। তখন চার মাসের জন্য তিনি কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন। বর্তমান সরকার ঘোষিত শিক্ষানীতি ও নারীনীতি নিয়ে তিনি সোচ্চার প্রতিবাদ করেন। নারীনীতির মধ্যে উত্তরাধিকারসহ সবপর্যায়ে নারীর সম-অধিকারের কুরআনবিরোধী ধারা বাতিলের জন্য দেশবাসীর প্রতি আন্দোলনের ডাক দেন। এক পর্যায়ে সম্পূর্ণ ন












