রংপুরে ৪ খুন: ‘দিনের আলোয় খোলা ছাদেই খুন হন গণপতি-স্ত্রী-মেয়ে’

0
5

রংপুর জেলা প্রতিনিধি

রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের চার সদস্য হত্যার ঘটনায় পুলিশের বক্তব্য এবং তদন্ত নিয়ে নানা প্রশ্নের মধ্যেই আবারও নতুন তথ্য জানিয়েছে পুলিশ। আদালতে আসামিদের দেওয়া জবানবন্দির বরাত দিয়ে পুলিশ বলছে, ঘটনার দিন শুক্রবার সকালে বাড়ির ছাদে হাঁটতে গিয়ে গণপতি চক্রবর্তী সেখানে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে দেখতে পান এবং তাঁদের ধমক দেন। এরপর ছাদের ওপরই তাঁকে হত্যা করা হয়। শব্দ শুনে স্ত্রী ও মেয়ে ছাদে উঠলে তাঁদেরও হত্যা করা হয়। পরে মা ও মেয়ের মরদেহ টেনে-হিঁচড়ে ছাদের সিঁড়ির কাছে সরিয়ে নেওয়া হয়।

আজ বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সকাল ১০টার দিকে এক ব্রিফিংয়ে আদালতে দেওয়া জবানবন্দির বরাত দিয়ে এসব তথ্য জানান রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ। তিনি বলেন, আসামিদের জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে পুলিশের আগের বক্তব্যের পাশাপাশি আরও কিছু নতুন তথ্য সামনে এসেছে।

পুলিশ কমিশনার বলেন, গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে যাওয়ার মূল কারণ ছিল সেখানে ইয়াবা সেবনের সুবিধা পাওয়া। তাঁর ভাষায়, ‘বাসার ছাদে গিয়েছিল। কারণ দেবুদের বাসার ছাদ ফাঁকা ছিল, সেখানে বাতাস চলাচল করে। ইয়াবা সেবনের সময় যে ধোঁয়া হয়, সেটি বাতাসে না থাকলে তাদের জন্য সুবিধা হয়। আর গণপতি স্যারের বাসার ছাদে দেয়াল আছে, ওই দেয়ালের ফাঁকে বাইরে থেকে তাদের দেখা যায় না।’

কমিশনার আরও জানান, ‘বাসার ছাদে তারা পানির ট্যাংকির আড়ালে বসে ইয়াবা সেবন করছিল। ভোরের আলো ফুটে গেছে, সেটি তারা খেয়াল করেনি।’ তিনি বলেন, ‘ওই রাতে তারা দুজন মিলে আটটি ইয়াবা সেবন করে। এটি সিদ্ধার্থের জবানবন্দিতে বলা হয়েছে। জীবনে তারা কখনো এত বেশি ইয়াবা সেবন করেনি। একসঙ্গে সর্বোচ্চ দুইটি ইয়াবা সেবন করেছিল।’

মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বলেন, ‘সকালে ছাদে হাঁটতে গিয়ে গণপতি স্যার তাদের দেখে ফেলেন। এরপর ধমক দিয়ে জোরে জোরে বলেন, ‘তোরা এত সকালে এখানে কী করিস?’ তখন তাদের মাথা ঠিকমতো কাজ করছিল না। আত্মসম্মানের কারণে মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস গলায় গামছা পেঁচিয়ে টান দিয়ে গণপতিকে হত্যা করে।’

স্ত্রী ও মেয়েকে হত্যার ঘটনা তুলে ধরে পুলিশ কমিশনার বলেন, ‘স্যারের মরদেহ টেনে ঢেকে রেখে পালিয়ে যাওয়ার সময় সম্ভবত স্যারের স্ত্রী ও মেয়ে শব্দ শুনে ছাদে চলে আসে। তাদের দেখে চিৎকার শুরু করলে মুগ্ধর হাতে থাকা স্যারের গামছা দিয়ে তাঁর স্ত্রীর গলা চেপে ধরে। আর সিদ্ধার্থ দাস স্যারের মেয়ের গলা চেপে ধরে। এক হাতে মেয়ের গলা চেপে ধরে এবং অন্য হাতে মুখ চেপে ধরে। মুগ্ধ স্যারের স্ত্রীকে হত্যার পর ওই গামছা দিয়ে আবার দুজন মিলে মেয়ের গলায় পেঁচিয়ে দেয়। এতে মেয়েটি মারা না গেলে পাশের কবুতরের খাবার রাখার বাক্স থেকে রশি এনে মেয়েটির গলায় পেঁচিয়ে দুই দিক থেকে টান দেয়।’

পুলিশ কমিশনার জানান, এরপর আসামিরা গণপতির ঘরে প্রবেশ করলে তাঁর ছেলে প্রিয়ম ঘুম থেকে উঠে সিদ্ধার্থকে দেখতে পায়। তিনি বলেন, ‘বাচ্চাটা সিদ্ধার্থকে দেখে বলে, ‘সিদ্ধার্থ দাদা, তুমি এখানে কেন?’ দেবুদের বাসার কেউ শব্দ শুনে বিষয়টি জেনে ফেলতে পারে, এই আশঙ্কায় বাচ্চাটাকে কাপড় দিয়ে গলা পেঁচিয়ে তারা হত্যা করে।’

পুলিশ কমিশনার জানান, এর আগে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, শিশুটি ঘুমন্ত অবস্থায় হামলার শিকার হয়। তবে আদালতে দেওয়া সিদ্ধার্থের জবানবন্দিতে বলা হয়েছে, শিশুটি ঘুম থেকে উঠে সিদ্ধার্থকে দেখে ফেলে।

হত্যাকাণ্ডের পেছনে আরও দুটি বিষয় তদন্ত করে দেখা হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ। তাঁর ভাষ্য, ‘সিদ্ধার্থ দাসের আদালতে দেওয়া জবানবন্দির সূত্র ধরে একটি বিষয় সামনে এসেছে যে, তার পূর্বপুরুষের জমি তারা কিনেছিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘পূর্বপুরুষের জমিটি সম্ভবত কিছুটা বেশি দামে কেনা হয়েছিল। ওই জমি কেনার বিষয়টি হয়তো তাদের বংশের শরিকরা ভালোভাবে নেয়নি। তাদের শরিকদের মধ্যে যারা ছিলেন, তাঁরা যে টাকা পাওয়ার কথা ছিল, তাঁদের অংশীদাররা সেই টাকা পাননি। আনুপাতিক হিসাবে শরিকদের যে অংশ ছিল, সেই অর্থও তারা পায়নি। এ নিয়ে তাদের মনে ক্ষোভ তৈরি হয়ে থাকতে পারে। আমরা সেই বিষয়টিও খতিয়ে দেখছি।’

সামাজিক ব্যবধানের বিষয়টিও তদন্তের অংশ বলে জানিয়েছেন আবদুল মাবুদ। তিনি বলেন, ‘আরেকটি বিষয় হলো, গণপতি স্যারদের পরিবারের সঙ্গে মাছুয়াপাড়ার অধিকাংশ মানুষ দাস বংশের। অন্যদিকে স্যাররা ব্রাহ্মণ জাতির। এ কারণে তাদের মধ্যে কিছুটা ব্যবধান ছিল। অর্থাৎ মেলামেশা বা রাস্তাঘাটে দেখা-সাক্ষাৎ হতো, কিন্তু বাসায় আসা-যাওয়া ছিল না। এ বিষয় নিয়েও তাদের মনে কোনো ক্ষোভ ছিল কি না, তা দেখা হচ্ছে।’

সংবাদ সম্মেলন শেষ হওয়ার পর সাংবাদিকেরা বিভিন্ন প্রশ্ন করলেও কোনো জবাব না দিয়ে সেখান থেকে চলে যান পুলিশ কমিশনার।

এর আগে পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ জানিয়েছিলেন, গত বৃহস্পতিবার শেষ রাতে শব্দ শুনে ছাদে উঠে ইয়াবা সেবনের বিষয়টি দেখে ফেলায় গণপতি চক্রবর্তীকে হত্যা করা হয়। তাঁর মা ও মেয়েকে সিঁড়িতে হত্যা করা হয়েছিল। এরপর মামলার এজাহার, আলামত ও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ার বিষয়সহ পুরো ঘটনাকে ঘিরে নানা আলোচনা ও সমালোচনা তৈরি হয়।

গত শনিবার গভীর রাতে গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে পার্থী চক্রবর্তী আগামী (২৫) এবং ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তী আয়ুশের (১২) মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে এ ঘটনায় মামলা করা হয়। এরপর থানায় থাকা তদন্তের দায়িত্ব মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দুই আসামি আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।


রংপুরে ৪ খুন: ‘দিনের আলোয় খোলা ছাদেই খুন হন গণপতি-স্ত্রী-মেয়ে’

Share this news as a Photo Card

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here